বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার : তিরিশ বছর এবং অতঃপর

graam-theatre_seminar_13লুৎফর রহমান

প্রিয় সহকর্মী!
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার কেন্দ্রীয় পর্ষদ আয়োজিত আজকের সেমিনারের শ্রদ্ধেয় সভাপতি, অতিথিবৃন্দ এবং সহকর্মী বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের জাতীয় পর্ষদ, নির্বাহী পর্ষদ, আঞ্চলিক পর্ষদ, বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা থিয়েটারের কর্মীবন্ধুরা, আমার আন্তরিক সালাম গ্রহণ করুন। সেই সঙ্গে অকৃত্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি সেমিনারে উপস্থিত সহযোগী ও অন্যান্য সংগঠনের সাংস্কৃতিক কর্মীবন্ধু ও নেতৃবৃন্দকেও।
ত্রিশ বছর গেছে বাংলার পথেপ্রান্তরে শ্রমজীবী নিরন্ন মানুষের অভাবনীয় সংগ্রামী জীবনের বিচিত্র পুরাণকথা কুড়িয়ে যে গ্রাম থিয়েটার কর্মীবন্ধুর, বড় আপ্লুত তিনি আজ। নিশ্চয়ই নিজের কীর্তির জন্য অন্তরে গৌরববোধ করেন তিনি, কখনো ব্যর্থতার চাপা দীর্ঘশ্বাসও তাঁকে উড়িয়ে দিতে চায় হয়তো। তবু তিনি পথ কাটেন ভবিষ্যতের দিকে। আমি তাঁকে সম্মান করি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় নত হয় মাথা। যাঁরা ত্রিশ বছরের প্রাপ্তির হিসাব না কষে আজও পরিজনসহ সীমাহীন কষ্টে সংগঠনের জন্য ঘাম ঝরান, অকাতরে নমস্য তাঁরা- এই মঞ্চ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁদের প্রতি।

স্বজন বন্ধুরা!
অপার আনন্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণে মনটা বিষাদে-বেদনায় ছেয়ে আছে। কারণ, খড়গসম সত্য এই যে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের স্বপ্নদ্রষ্টা নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন আজ গৌরবের ত্রিশ বছর উদযাপনকালে এই উজ্জ্বল সভায় অনুপস্থিত। যখন ভাবি তিনি এখানে নেই, মন বলে, বনে যখন ফুটল কুসুম নেই কেন/ সেই পাখি নেই কেন? সেই সঙ্গে নিশ্চিত হই-তবে তো উত্থাপিত অমীমাংসিত অনেক প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়ার কোনোই উপায় নেই আর! সেসব প্রশ্নের উত্তর তো তাঁরই দেওয়ার কথা। বিপন্ন বোধ করি আমি। তাঁর বিদেহী আত্মার কাছে নতজানু হই বারবার। একই সঙ্গে প্রণতি জানাই সেসব মহৎ প্রাণ গ্রাম থিয়েটার কর্মীর আত্মার উদ্দেশে, যাঁরা ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন।

সংগ্রামী বন্ধুরা!
গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভাঙা মানুষদের নড়বড়ে জীবনঘষে সৃষ্ট হীরণ্ময় সংস্কৃতিকে বিশ্ব মানবের সংস্কৃতির সিংহদ্বারে পৌঁছে দেওয়ার দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার অতিক্রম করেছে গৌরবোজ্জ্বল ত্রিশটি বছর। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় জীবনের কোন বিশেষ প্রয়োজনে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের উদ্ভব ঘটে, সে ইতিহাসের প্রসঙ্গ করা আজ এই অধিবেশনে একান্তই নিষ্প্রয়োজন কারণ সে আপনাদের জানা। এবং আজ জাতীয় জীবনের কোন দুঃসময়ে ত্রিশ বছর উদযাপন উপলক্ষে এই সেমিনার আয়োজন, সে বিষয়টিও বিদ্যমান আপনাদের দৈনন্দিনের অভিজ্ঞতার আওতায়। তাই অনিবার্য কারণেই অতিক্রান্ত ত্রিশ বছর এবং অতঃপর করণীয় আমাদের আজকের প্রতিপাদ্য-

প্রিয় সহকর্মী!
বক্ষ্যমাণ রচনার প্রথমভাগে সংগঠনটির ত্রিশ বছর কাল পরিধির মধ্যে যে বিপুল অর্জন, তার প্রতি অনুসন্ধানী দৃষ্টি সম্পাত করা এবং দ্বিতীয় ভাগে ত্রিশ বছরের সফলতার প্রজ্বালিত মশাল হাতে ব্যর্থতাগুলোকে পায়ে দলে পরিবর্তিত আর্থরাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থায় সম্ভাব্য করণীয় সম্পর্কে রচয়িতার ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করার প্রয়াস রয়েছে।

* স্বপ্নদ্রষ্টা সেলিম আল দীন প্রদত্ত খতিয়ান অনুযায়ী বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সংগঠন তালুকনগর থিয়েটার; প্রথম মেলা তালুকনগরের আজাহার বয়াতি মাঘী মেলা; প্রথম গ্রাম থিয়েটার কর্মী রফিক মাহমুদ; প্রথম নাটক সেলিম আল দীন রচিত সয়ফুলমুলকের দইরা যাত্রা।

* গ্রাম থিয়েটারের আদর্শে বিশ্বাসী প্রথম গ্রামীণ নাট্যকর্মী আমিনুর রহমান মানিক। ত্রিশ বছর আগে যে আদর্শের ভিত্তিভূমিতে গ্রাম থিয়েটারের উদ্ভব, তার তাত্ত্বিক একটা কাঠামো দাঁড়াল প্রাথমিক নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ

ক. গ্রামীণ জনগণকে তাদের জীবনের নানা অনুষঙ্গসমেত অভিন্ন স্থানে সমবেত করার উদ্দেশ্যে মেলা পত্তন করা।

খ. মেলায় বাঙালি সংস্কৃতির পরিবেশনামূলক আঙ্গিকগুলো উপস্থাপন করা।

গ. বৃত্তাকার ও চৌকোণ খোলা মঞ্চের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

ঘ. শ্রমজীবী জনসাধারণের রুচি ও রসগ্রহণোপযোগী নাটক রচনা এবং পরিবেশনা।

ঙ. নাগরিক ও গ্রামীণ সংস্কৃতির ব্যবধান ঘোচাতে প্রচল পরিধি ভেঙে আধুনিক জীবনের উপযোগী জাতীয় সংস্কৃতির একটা বাস্তব রূপরেখা নির্মাণের জন্য ঐতিহ্যবাহী নাট্য আঙ্গিক অনুসন্ধান, সংগ্রহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার নবীকরণ।

চ. গ্রামীণ নাট্যকর্মী সৃষ্টি ও গ্রামে গ্রামে গ্রাম থিয়েটার সংগঠন গড়ে তোলা। বলাবাহুল্য, উপর্যুক্ত আজাহার বয়াতি মাঘী মেলা ও তালুকনগর থিয়েটার শিকড়ের ডানা গজানোর সূচনামাত্র।

*স্বপ্নের দ্বিতীয় স্তরে সমগ্র বাংলাদেশে গ্রাম থিয়েটার সংগঠন ও মেলা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে চারটি বিভাগে যুগপদ সাংগঠনিক কাজ আরম্ভ হয় ১৯৮১ সাল থেকে। ঢাকা বিভাগের দায়িত্বে সেলিম আল দীন, রাজশাহী বিভাগ পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন হুমায়ুন ফরিদী, খুলনা বিভাগ জহিরুদ্দিন পিয়ার এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পর রচিত হয় ঘোষণাপত্র। নিঃসন্দেহে নানা সমস্যা, বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে ঘোষণাপত্রে বিঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রয়াস অব্যাহত ছিল ত্রিশ বছর। কতটা তার বাস্তবায়ন হয়েছে, হয়নি কতটা, ঘোষণাপত্রের মলাট খুলে মুদ্রিত বক্তব্যের মর্মোদ্ধারের মাধ্যমেই তা স্পষ্ট হতে পারে-

*ঘোষণাপত্র :
* পদ্মা মেঘনা তিতাস ও অশান্ত বঙ্গোপসাগরের কূলে আমাদের বাস। শত শত বছরের ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিম-লে আমরা বেড়ে উঠেছি। হাজার বছরের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি।
* বাংলাদেশের মঞ্চে তাই আমরা আমাদের নিজেদের জীবন, পরিণ্ডল ও লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরতে চাই।
* শুধু বিদেশি নাটক করার অর্থ হচ্ছে নাটকে বাংলাদেশের মানুষ ও তাদের সত্যিকার জীবনচিত্রকে অবহেলা বা অবজ্ঞা করা।
* ঢাকা থিয়েটার মেরুদণ্ডহীন আপসকামী নাট্যচর্চার বিরুদ্ধে প্রাণবন্ত ও প্রাণদায়ী নাট্যচর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সাংস্কৃতিক ভিক্ষাবৃত্তি ও লেজুড়বৃত্তিকে ঢাকা থিয়েটার তীব্র ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপন করে।
* ঢাকা থিয়েটার আধুনিক নাট্যকলার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব নাট্য আঙ্গিকের সমন্বয় সাধনে বদ্ধপরিকর। এই জন্য আমরা চর্যাপদ থেকে পদ্মাবতী তথা বাংলাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিল্পকলা ও সাহিত্যরীতির যেকোনো আঙ্গিকের দিকে হাত বাড়াতে প্রস্তুত।
* ঢাকা থিয়েটার শহরকেন্দ্রিক নাটক মঞ্চায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে নাটকের দল গঠন ও মেলা পত্তনে দৃঢ় সংকল্প। ঢাকা থিয়েটার শুধু জাতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসকে ব্যাখ্যাই করবে না, তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে সচল ও উপযুক্ত করে তুলতে বদ্ধপরিকর। ঢাকা থিয়েটার মঞ্চে তথা আমাদের তাবৎ শিল্প ও সাহিত্যকর্মে বাংলাদেশের জনগণ জনপদের সংস্কৃতি ও অবহেলিত পদ্মাপারের ভাষারীতির উজ্জীবন ঘটাতে চায়।
ঘোষণাপত্রে জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশের একটা আত্মিক তাগিদ গভীরতর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তি পেয়েছে। অনেকে হয়তো এর মধ্যে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের অসংকোচ উপস্থিতি অনুসন্ধান করবেন। তাঁদের উদ্দেশে কেবল এ কথাই বলা চলে, কাজ নাই সখী তাদের কথায়/ বাহিরে রহুন তারা। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা একটা স্বাধীন জাতি তার সংস্কৃতির ডানায় বাতাস কাটার আগে শিকড়মুখী হবে, এটাই স্বাভাবিক। শিকড় রস জোগালে তবেই তো পত্র-পুষ্পসহ আকাশমুখী হয় বৃক্ষ। জাতীয় সংস্কৃতির ভিত সুদৃঢ় হওয়ার আগে যে জাতি বিশ্ব সংস্কৃতির মহাসমুদ্রে অবগাহন করতে চায়, তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হবে, এ সত্য ঐতিহাসিক। আত্মরক্ষার যোগ্যতা যার নেই, বিপন্ন সে- হতমান। অতএব গ্রাম থিয়েটারের ঘোষণাপত্র বাঙালির জাতিসত্তার উন্মেষলগ্নের আকাক্সক্ষাপ্রসূত জাতীয় সংস্কৃতির অবয়ব নির্মাণকালীন নিখাদ অঙ্গীকার। বিচার্য সেই অঙ্গীকার রক্ষায় বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার নেতা ও কর্মীরা কতটা সক্রিয় এবং সচেতন ছিলেন, তা-ই বিচার্য। নিচে আমার পর্যবেক্ষণটি দ্বিধাহীন উপস্থাপন করতে অভিলাষী। সে ক্ষেত্রে সংগঠনের একজন সদস্য হিসেবে সব দায় স্বীকার করেই বলছি, ত্রিশ বছরে আমাদের অর্জন অনেক, কিন্তু তা অবশ্যই ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে ওঠার মতো নয়।

সুজন বন্ধুরা!
যতদূর মনে পড়ে সপ্তম বাংলা লোকনাট্য উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত পুস্তিকায় পূর্ব কথার পরের কথা শিরোনামের একটি নাতিপরিসর রচনায় গ্রাম থিয়েটারের তৎকালীন অবস্থা, কার্যক্রম এবং আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করেছিলাম। আপনাদের অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে সংগঠনের জন্য কতটা দুঃসহ ছিল সেই মূর্খত্ব। এই সেমিনারে আপনাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে অসংকোচে বলছি, সেই মূর্খত্ব আজও ঘোচেনি আমার, মতের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। সমাজ বিকাশের ঐতিহাসিক ধারাটি যদি মানেন, তবে তো স্বীকার করতেই হবে ১৯৮০ সালের বাংলাদেশ এখন সময়ের হাওয়ায় হাওয়ায় উধাও। বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টে গেছে সম্পূর্ণত। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের মধ্য দিয়ে পুঁজিতন্ত্র আজ চালকের আসনে বসে স্টিয়ারিং ঘোরায় যখন যেমন খুশি। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে সমগ্র বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করেছে রূপান্তরিত সাম্রাজ্যবাদ। শ্রেণিশোষণপ্রক্রিয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে জাতিশোষণপ্রক্রিয়া। দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সদা সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয়ে শঙ্কিত, তটস্থ। অন্যায়ভাবে লুণ্ঠিত হচ্ছে জাতিগুলোর সম্ভ্রম। বিশ্ব রাজনীতির দশচক্রের ফলভোগ করছে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি। ব্যবহারিক ও মানস সংস্কৃতি উভয়ই আধিপত্যবাদের দাঁতে-নখে ক্ষতাক্ত-রক্তাক্ত। ইন্টারনেট, ফেসবুক, ব্লগ, কেবল-টিভি ইত্যাদি মারণাস্ত্র হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও অধিক ক্ষতিসাধন করছে সাংস্কৃতিক বিশ্বের। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব-সমাজের নৈকট্য বৃদ্ধি পেয়েছে, মানব সংগ্রহশালায় সঞ্চিত হয়েছে কোটি কোটি বছর আগের বিশ্বজগতের বিপুল তথ্যপুঞ্জি এবং জগৎময় বিদ্যমান মানুষের যত কীর্তিগাথা সন্দেহ নেই, কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছে মানবতার। মানবিক অনুভূতি ও আবেগ জড় প্রযুক্তির অমোচ্য সংস্কৃতির দাপটে ত্রাহি ত্রাহি করছে। জাতি আদর্শহীন রাজনৈতিক দলগুলোর অবিমৃশ্যকারিতায় উদ্বিগ্নÑবিপর্যস্তও বটে। এক নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের যুদ্ধাবস্থার চেয়েও ভয়াবহ ও নিরাপত্তাহীন করে তুলছে সাধারণের জীবনকে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি দেশের সর্বত্র আবার স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে। সাংস্কৃতিক সংঘাত জাতিকে পুনরায় দ্বিধাবিভক্ত করেছে ১৯৭১-এর মতো। যখন দেশব্যাপী অকল্পনীয় অরাজক অবস্থা বিরাজমান, তখনই গ্রাম থিয়েটারের এই সেমিনার আয়োজন। সংগত কারণেই প্রবন্ধের শিরোনাম নির্ধারণে সত্যকে ত্রিকালের নিকষে যাচাই করার অদম্য আকাক্সক্ষা ছিল সক্রিয়। শ্রোতাবন্ধু! ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ালে যে সত্য প্রকাশিত হবে, সেখানে আমি এমনকি আপনিও অভিযুক্ত। বিচারক জনগণ যাদের সংস্কৃতিকে বিশ্ব-সভায় সগৌরবে অধিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার আপনারা করেছিলেন, আমি সঙ্গে ছিলাম। জনতার অভিযোগ আমরা সে অঙ্গীকার রক্ষায় সফল হতে পারিনি।
সে কারণেই ত্রিশ বছরের খতিয়ান নির্ণয় অতি জরুরি। গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে তিন দশকে ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতির সবগুলোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। না হওয়ার কারণে সাংগঠনিক কাজে সৃষ্টি হয়েছে অনাকাক্সিক্ষত স্থবিরতা। সাংস্কৃতিক দল বলেই অবাধ লুণ্ঠন ক্রিয়ায় এরা অংশ নিতে পারেনি। হত্যা, দর্শন, গুম, চাঁদাবাজি ইত্যাকার কোনো প্রকার সামাজিক অকল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারেনি। আবার আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ শ্রম, দূরদর্শিতা ও আত্মত্যাগ একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্য আবশ্যক গ্রাম থিয়েটার কর্মীরা তা কোনোভাবেই পাননি। যা হতে পারত, তা হয়নি, যেমন-
* সমগ্র দেশে সংগঠন গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলাম, তার আংশিক পূরণ হয়েছে। দেশের সব জেলায় বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সব বিভাগে বা অঞ্চলে সমসংখ্যক সংগঠনও নেই। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ ছাড়া অন্যান্য বিভাগের সচল সংগঠনসংখ্যা খুবই অপ্রতুল। বিস্তারে বলা যায়, নব্বইয়ের দশকে সক্রিয় সংগঠনের সংখ্যা যা ছিল, তা মোটেও বৃদ্ধি পায়নি বরং তা কমেছে। প্রথম দিকের সংগঠন বংশাই থিয়েটার অস্তিত্বহীন তা প্রায় দেড় দশক। সে সময়কার উজ্জ্বল সংগঠন হোসেনপুর থিয়েটার অভিন্ন অবস্থায় স্মৃতিজাগানিয়া প্রসঙ্গমাত্র। রাজবাড়ি থিয়েটার আদর্শভিত্তিক থিয়েটার হিসেবে অঢেল সম্ভাবনার ধারক ছিল। তার অবস্থা এমন যে আমাদের কারও আর রাজবাড়ি যেতে হয় না, আসেও না কেউ খবর দিতে। নগরকান্দা থিয়েটার মোসাদ্দেক মিল্লাতকে গ্রাম থিয়েটারের কেন্দ্রীয় পর্ষদে পৌঁছে দিল বটে, কিন্তু নিজে সে হলো নিশ্চিহ্ন। যেন একটা কাঁকড়া, যে বাচ্চা ফোটার পরই আত্মদান করে। টাঙ্গাইলের বেঙ্গরোয়া গ্রামের থিয়েটার এবং নায়েব আলী বয়াতি মাঘী মেলা পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উধাও আজ। একই সঙ্গে গ্রাম থিয়েটারের প্রথম দশকের একনিষ্ঠ কর্মী সালাম সাকলাইন এবং সম্ভাবনাময় একজন নাট্যকার ওই সংগঠনের স্রষ্টা-তিনি এক বিরুদ্ধ পরিবেশে সংসারী যোগী এখন। একসময়ের কালিয়াকৈর থিয়েটার- যারা ঢাকা বিভাগীয় সম্মেলন আয়োজন করেছে সার্থক ও সুন্দরভাবে- আজ সে সংগঠন ও কর্মীরা কোথায়, তা জানা নেই আমাদের। তালুকনগর থিয়েটার, যেখানে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে, তা গ্রাম থিয়েটার কর্মীদের তীর্থস্থানে পরিণত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেই সংগঠনের বেহালের কথা কারও অজানা নয়। এমন ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা সর্বত্র। উল্লিখিত তথ্যগুলো প্রমাণ করে কোন অজ্ঞাত কারণে আমরা একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সমগ্র বাংলাদেশের সংগঠনগুলোকে একটি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করিনি। রাজা যায় রাজা আসে- এরূপভাবেই সংগঠন জন্ম নিয়েছে, মরেও গেছে। যেখানে অস্তিত্বশীল সংগঠন আছে, সেখানে কর্মীরা আসছেন, আপন প্রয়োজনে চলেও যাচ্ছেন। কোথাও কর্মীদের প্রত্যাশা ছিল থিয়েটার ভুবনের কেউকেটা বনে যাওয়া নয়, এই সংগঠনের আদর্শের অভ্যন্তরে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যে ইঙ্গিত বা সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে স্বীয় মেধা ও শ্রম ঢেলে দেওয়া। এ কথা বিস্মৃত হলে চলবে না যে গ্রামীণ সমাজে বা উপজেলা পর্যয়ে যে সচেতন যুবক, যুবতী থিয়েটার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়, স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গেও তার একটা সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে যে পরিবেশ বিরাজ করে, তা সব সময় সুস্থ নয়Ñদম ফেলার জন্য, নিজেকে পারিপার্শ্বিকের চাপ থেকে রক্ষার জন্য, সক্রিয়ভাবে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সে একজন সামাজিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে আগ্রহী। তার সম্মুখে সে গ্রাম থিয়েটারকে যখন ক্রমাগত নিষ্ক্রিয় হতে দেখে, দেখে নামসর্বস্ব হতে, তিন বছরেও যখন কোনো নাটক প্রযোজনা হয় না, সে নিজেকে পরাজিত মনে করে। একদিন সে চলে যায় অন্য কোনোখানে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে চাকরি নিয়েও অন্যত্র চলে যায়, কখনো দেশের বাইরেও চলে যায় রুটিরুজির নিমিত্তে। চলমান জীবনের অন্তরায় নয় থিয়েটার, তাই এই যাওয়া দোষেরও কিছু নয়, কিন্তু সেই শূন্যস্থান যখন পূরণ হয় না, তখনই পরিষ্কার হয় যে সাংগঠনিক এমন একটা ফাঁক ও ফাঁকি আছে, যার মধ্য দিয়ে সার পদার্থটি হাওয়ায় মেলাচ্ছে। আমার বিবেচনায় গ্রাম থিয়েটার ধারণাটিকে এর স্বপ্নদ্রষ্টা সেলিম আল দীন যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমরা অনেকেই নিঃশেষে মিলতে পারিনি। চাইনি তাঁর তাত্ত্বিক অবয়বটি বুঝতে, নিজেরা চর্চা করতে। সম্ভবত এ বিষয়টাও আমাদের চেতনাকে আলোড়িত করেনি যে মেলা প্রতিষ্ঠিত হলো; গ্রাম থিয়েটারের নাটকগুলোর মধ্য দিয়ে গ্রামীণ অসচেতন উৎপাদক শ্রেণিকে তার শত্রু শোষকের সত্যিকার চেহারাটা সম্পর্কেও সচেতন করা গেল; ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের আঙ্গিক ও অভিনয়রীতি আধুনিক শিল্পবুদ্ধিসম্পন্ন, সূক্ষ্ম রুচির নাগরিক নাট্যকার আত্মস্থ করলেন এবং ওই রীতিতে নাটক রচনা করলেন; অভিনেতা অভিনয় করে হাজার রাতের সফল মঞ্চাভিনেতা হিসেবে নাম খোদিত করলেন কালের কষ্টিপাথরে, কিন্তু তারপর? তার পরের প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি কোনো গ্রাম থিয়েটার কর্মীর- কারণ তিনি নিরক্ষর শ্রমজীবী- রিকশা বা ভ্যানচালক অথবা বর্গাচাষি, মুটে কিংবা দিনমজুর তাঁর পক্ষে উপর্যুক্ত কোনো ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নেই; তবে এই কর্মীটি কেন গ্রাম থিয়েটার সংগঠনের সঙ্গে তাঁর অপরিহার্য বিশ্রামের সময়টি থিয়েটারে ব্যয় করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমরা গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রম শুরু হওয়ার দিনও করিনি আজও করছি এমনটা অন্তত আমার মনে হয়নি। শ্রদ্ধেয় সহকর্মী! আমার এ কথাগুলো একান্তই আমার উপলব্ধিজাত চিন্তার প্রকাশমাত্র। এর সঙ্গে আপনাদের একমত হতে হবে এমন দাবি নেই আমার। আপনারা উপস্থিত সবাই বিরোধিতা করলে বা এর সত্যতা অস্বীকার করলে যে আমার মতের কোনোরূপ পরিবর্তন হবে তা-ও নয়। কারণ থিয়েটার-ভুবনে আমাকে ছাড়পত্র দিয়েছে এই গ্রাম থিয়েটার। আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এখানেই- দেখতে দেখতে, নীরব পাঠগ্রহণের মাধ্যমে। একজন শিক্ষার্থীর মতোই বুঝতে গিয়ে আমি শিখেছি, শিখতে গিয়ে ফাঁকটা চোখে পড়েছে। আজ প্রকৃতপক্ষে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গেলে যেসব স্থানে আটকে যাই, সেই প্রসঙ্গগুলোই আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করছি। যদি আপনাদের ধৈর্যের বাঁধন অটুট থাকে, তবে কথনীয় যা, তা শেষ করতে চাইÑসুযোগটা দিয়েছেন যখন! বন্ধুরা, অতীত আমার অতি প্রিয় বিষয়, যা নেই সে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আমার চেতনার দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে যায়। তার কল্যাণে যাকে নিয়ে মুখোমুখি বসি, সে আর এক বর্তমান এবং সেই মুহূর্তের ঘটমান বর্তমান। দুটি বর্তমানের সামনে সে আমাকে হাজির করে। অতীত ঘটমান বর্তমান হলেই ত্রুটিগুলো সংশোধনের অবকাশ পাওয়া যায়; তত্ত্ব, দর্শন বা কর্মপদ্ধতিগুলো যা ত্রুটিপূর্ণ প্রতিভাত হবে, তা পরিবর্তন, পরিমার্জন ও রূপান্তর করে নতুন প্রয়োজনে অধিকতর বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। আগের ভুলগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও তাতে পাওয়া যেতে পারে। যদি অভয় দেন তবে কথা বলি, যা কেবল আমারই কথা।
*গ্রামীণ সমাজের বৃহত্তম অংশ কৃষক এবং তাঁরা উৎপাদক-অখণ্ড অবসর বলতে তাঁদের জীবনে কোনো সময় নেই। সেই অর্থে বিনোদনেরও কোনো নৈমিত্তিক পরিকল্পনা থাকে না তাদের। নাটক দেখাতে হলে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষকে একত্র করা দুঃসাধ্য- মেলা একটা উপলক্ষ যার মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষকে অনায়াসে সমবেত করা যায়। শুধু তা-ই নয়, মেলার ভিন্ন তাৎপর্য এই- আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিচিত্র সব উপকরণের সঙ্গে পরিচয় ঘটে মেলায়। জীবনের হাজারো বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির সব উপকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মীর চেতনালোক আলোকোদ্ভাসিত হতে পারে না। তাই মেলা পত্তনের মাধ্যমে নিজ নিজ অঞ্চলের সংস্কৃতি এবং জাতীয় সংস্কৃতির রূপগত বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে থিয়েটার কর্মীকে সচেতন করাই ছিল বস্তুগত উদ্দেশ্য। নতুন মেলা প্রতিষ্ঠা করা না হলে ওই প্রক্রিয়ায় গ্রাম থিয়েটার কর্মীকে পাঠদান আর সম্ভব নয়। ফলে আপন সংস্কৃতির সঙ্গে অনাকাক্সিক্ষত দূরত্ব সৃষ্টি হলো নবাগত কর্মীটির। পক্ষান্তরে সরাসরি সরবরাহ করার কারণে অপর সংস্কৃতির জ্ঞান হলো তার টনটনে। গত তিন দশকের প্রয়াসে নতুন কোনো মেলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, এ সংবাদটা কোনো অবস্থাতেই শুভঙ্কর নয়। জানি আবেগবশত নতুন প্রতিষ্ঠিত মেলার একটা-দুইটা নাম বলবেন কেউ কেউ, কিন্তু তা এ ক্ষেত্রে বিবেচনার যোগ্য নয়- কেননা, মেলার মতো একটা সামাজিক যজ্ঞ এক যুগ না চললে এবং তাতে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না থাকলে তাকে হিসাবের খাতায় ঠাঁই দেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠিত অনেক মেলা বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সংগঠন মরে যাওয়ার পরও বেহাত অবস্থায় মেলা অস্তিত্ব রক্ষা করছে। একসময়কার বলিষ্ঠ সংগঠন বংশাই থিয়েটার দেড় দশকেরও আগে অস্থিত্বহীন হয়ে পড়ে। থিয়েটার কার্যক্রম না থাকলেও দারোগালী বয়াতি মাঘী মেলা প্রতিবছরই অনুষ্ঠিত হয়। এবং প্রকৃত বাস্তবতা এই, দূর-দূরান্ত থেকে পণ্যসামগ্রী নিয়ে নির্ধারিত দিন হাজার মানুষ উপস্থিত হয় দারোগালী বয়াতি মাঘী মেলার নির্ধারিত স্থানে- আসে সর্বস্তরের মানুষ, ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনস্থলে পরিণত হয় আগের মতোই, কিন্তু মেলা নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। সমাজগর্হিত কার্যও পরিচালিত হয় বলে শোনা যায়। গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত একটি মেলা, এভাবে বেহাত হয়ে গেছে সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে। আবার বংশাই দারোগালী বয়াতি মাঘী মেলার বর্তমান অবস্থা এটাও প্রমাণ করে যে সমগ্র দেশে অনুরূপ মেলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে এবং তা যদি জনগণের চেতনায় স্থান করে নিতে পারে, তবে তাকে টিকিয়ে রাখবে তারাই। অনুরূপ তাদের সংস্কৃরি রং, রূপ, অবয়বটা ও তার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিতে পারলে সেটা রক্ষা করার দায়িত্বও তারাই গ্রহণ করবে। এ দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট হয় যে মেলা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন সেলিম আল দীন তিন দশক আগে দেখেছিলেন, তার বৈজ্ঞানিক একটা ভিত্তিও ছিল। কেবল ভাবনাকে কার্যে পরিণত না করার কারণে সব বিনষ্ট হতে বসেছে।

* জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এবং তাঁর সহযোগী অনেকেই বিস্তর গবেষণা পরিচালনা করেন। যেহেতু গ্রাম থিয়েটারের আদর্শ নির্ধারিত হয়েছিল জনগণের সংস্কৃৃতির সামাজিক রূপ ও শিল্পরূপ সৃষ্টি করা, সেহেতু জনগণের সংস্কৃতির বিদ্যমানরূপটা কী, তা জানা ছিল আবশ্যিক। পূর্বোক্ত গবেষণায় প্রতিভাত হয় বাংলা নাটকের নিজস্ব আঙ্গিকটি দ্বৈতাদ্বৈতেরÑঅন্তর্গত পরিচয়ে সে বর্ণনাত্মক। এ দেশের জনগণ উক্ত নাটক এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা। জনগণের থিয়েটারকে শিল্পিত ও কালোপযোগী করার দায় উত্তরাধিকারীর। সুতরাং বাংলা নাটকের অস্তিত্বের প্রতিটা সন্ধিস্থল শনাক্ত করা এং তার উপস্থিতি আপনার অস্তিত্বে অনুভব করা যখন একান্ত জরুরি, তখন নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে দেখা দিল শৈথিল্য। ফলে গঠনতন্ত্রের অন্যতম উদ্দেশ্যটা [প্রচলিত ও অবলুপ্ত লোক নাট্যকাঠামো ও শিল্পরীতির উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং চর্চা ও পরীক্ষা নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে আধুনিক নাট্যকলার সঙ্গে সমন্বয় সাধন (গঠনতন্ত্র : ৭.২)] গ্রাম থিয়েটারের সব কর্মীর না হয়ে কেবল নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের একক চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়। এর ফলে তাঁরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কখনো গঠনতন্ত্রে বর্ণিত উদ্দেশ্যটার মর্মগত তাৎপর্য অনুধাবন করতে চাননি। একজন কর্মী হিসেবে তাঁর বা তাঁদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে তাঁকে বা তাঁদের পূর্বাহ্নেই সচেতন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়টাও স্পষ্ট নয়। যে কারণেই হোক, গত তিন দশকে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের বর্ণনাত্মক রীতিটি সাধারণ গ্রাম থিয়েটার কর্মীদের চেতনায় এমনকি কোনো কোনো নেতৃস্থানীয় কর্মীর চেতনায়ও স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। একই কথা বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি সম্পর্কেও প্রযোজ্য। তার ফলে গঠনতন্ত্র কোনো কর্মীর নিকটই অবশ্য অনুসরণের বিষয় হয়ে ওঠেনি। এবং সব অমত উপেক্ষা করেও বলা যায়, প্রশিক্ষিত একজন কর্মীরূপে গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একজন গ্রাম থিয়েটার কর্মীকে অগ্রসর হতে হয় না। কর্মীর যোগ্যতার বিষয়টাও সেখানে অস্পষ্ট। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীর নির্ধারিত যোগ্যতার বাইরেও তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতার মাত্রাটা বিবেচনায় রাখা উচিত। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে সে বিষয়টা উপেক্ষিত। কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা, কর্মীই অনিয়মিত থাকার কারণে সাংগঠনিক স্থবিরত্ব সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়।

* বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিভিন্ন পেশার, নানা বয়সী বিচিত্র মানসিকতার নারী-পুরুষ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সামাজিক চেতনার নানা স্তরে তাঁদের অবস্থান। এরূপ একটা জনসংগঠনের সব কর্মীকে চিন্তার অভিন্ন স্তরে উন্নীত করে সাংগঠনিক কর্মে পরিচালিত করা সহজসাধ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে প্রশিক্ষণ, অনুশীলন, পাঠ, বিশ্লেষণ, ইত্যাদি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যথার্থ কর্মী গড়ে ওঠেন। উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় কর্মী সৃষ্টির জন্য পাঠাগার, পাঠচক্র ইত্যাদি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত আঁতুড়েই মরে গেছে- ফলে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আজও দেশব্যাপী তাদের কর্মকা- পরিচালনা করছে বটে, কিন্তু তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক কোনো দিক থেকেই কর্মীরা অনন্য যোগ্যতার দাবিদার নন। এর দায় কর্মীর নয়, সংগঠনের সদস্য পদপ্রাপ্তির পর সংগঠনের দায়িত্ব ওই সদস্যকে সংগঠনের প্রয়োজন অনুসারে গড়ে তোলা। সংগঠন তাঁকে যে কাজের উপযোগী বিবেচনা করবে, সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের নিমিত্তে প্রতিশ্রুত থাকা তাঁর দায়িত্ব। যোগ্য করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সংগঠন। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার তার জন্মলগ্ন থেকেই উপর্যুক্ত বিষয়গুলোকে অনুপুঙ্খ ভাবনা বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত করেছে কি না জানা নেই। সুনির্দিষ্ট একটা সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তা করা সম্ভবও নয়। যদি বাতুলতা না হয় তবে বলি, ও রকম কিছু বোধ হয় আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। বাংলাদেশে গ্রাম আজ বহু দূরের বস্তু। বৈদ্যুতিক বাতি আজ গ্রামীণ রাতের কুমারীত্ব হরণ করে। নাগর সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী ব্যান্ড সংগীত, রক-মিউজিক গ্রামীণ মেয়ের চোখের ওপর যে জগৎ উন্মোচিত করে, সে গ্রামীণ নয়-নাগরিক। গাছের পাতা নড়েচড়ে ঠিক, কিন্তু সে মেয়ের তোমার কথা মনে পড়ে- অথচ মন খারাপ হয় না, কারণ সেলফোন কানেমুখে ফিসফাস করার ব্যবস্থা করে দেয় সেই ক্ষণেই। ভালোবাসায়, বিরহে আজ আর কষ্ট নেই- জীবনে ক্লাইমেক্সও নেই আর। তবে তো সংগঠনের লক্ষ্য, আদর্শ, উদ্দেশ্য- এসব কিছুর পুনর্বিচার জরুরি। লক্ষণীয় যে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বর্তমান গঠনতন্ত্রে সংগঠনের কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি। তবে তো বহমানতাই এর লক্ষ্য- অতএব লক্ষ্য অর্জনের কোনো তাগিদও নেই। তাই হয়তো সংগঠন আছে, তার নিজস্ব কোনো তহবিল নেই। তহবিল না থাকার অর্থ সবার তহবিলই আমার তহবিল। তাতে চলে কী করে, সংবৎসর বিচিত্র খরচ পরনির্ভরশীল মানুষ যেমন স্বাধীনভাবে কোনো কাজ বা ভাবনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে না, অপরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল সংগঠনও তা-ই। আর এ জন্যই লেখা হলো তো টাকার অভাবে বুলেটিন প্রকাশ সম্ভব হলো না। তিনটা সংগঠনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, যিনি যাবেন তাঁর স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়ার শারীরিক যোগ্যতা রয়েছে, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য আছে কি? না থাকলে তাঁর ইচ্ছা ও মানসিক প্রস্তুতি থাকার পরও তিনি যেতে পারলেন না কেবল আর্থিক কারণে। সংগঠনটা নিজের সমস্যা নিয়ে আরও সমস্যার আবর্তে ডুবে গেল। আবার দেখুন একটা সংগঠন আঞ্চলিক বা বিভাগীয় সম্মেলন বা নাট্যোৎসবের আয়োজন করল চাঁদাবাজি করা সম্ভব হলো না ঋণ করে উৎসব বা সম্মেলন শেষ করলেন, ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে নাট্য সংগঠনটা দাঁড়াবে কোথায়? অতএব তাকে আর দেখা গেল না। সুতরাং এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে দেশব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সমান ও সমান্তরালে পরিচালিত করার নিমিত্ত যে পরিমাণ আর্থিক সংগতি থাকা উচিত, তা না থাকায় প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই সাংগঠনিক কাজে কাক্সিক্ষত গতিসঞ্চার সম্ভব হয়নি।

* জাতীয় পর্ষদ, কেন্দ্রীয় পর্ষদ, আঞ্চলিক সমন্বয় পর্ষদ, গ্রাম থিয়েটার পর্ষদ ইত্যাদি সাংগঠনিক স্তরবিশিষ্ট গঠনতন্ত্রনিয়ন্ত্রিত একটা আদর্শভিত্তিক সংগঠনের কোনো নিজস্ব তহবিল নেই, এ একেবারেই অভাবনীয়। বোঝাই যাচ্ছে, শুধু সদস্যদের চাঁদায় ১৫০-২০০ ইউনিটের সংগঠন পরিচালনা করা অস্বাভাবিক। প্রথম দশকেই একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও কোনো উদ্যোগের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে গ্রাম থিয়েটারের কর্মীবন্ধুদের কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন সৃষ্টি হতো, তেমনি সেই বিশেষ অঞ্চলের থিয়েটার কর্মী ও তাঁদের আত্মীয়স্বজন হতেন ব্যাংকের গ্রাহক। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের জন্য থিয়েটারের কাজ নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক করা যেত অনায়াসে। গ্রাম থিয়েটার ব্যাংক নামেই সে ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণ করা যেত। আমাদের সিদ্ধান্তের বাস্তব অবয়ব সৃষ্টি হলো না কেন, সে প্রশ্ন আজ বারবার মনে জাগে। যখন প্রতিক্রিয়াশীল কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে দেখি, কর্মীর আর্থিক ও শারীরিক সুস্থতার কথাটা তারা প্রথমেই ভেবেছেÑতার কর্মীরা জীবন দিচ্ছেন সংগঠনের জন্য, তখনই মনে পড়ে আমরা পারলাম না কেন?

* জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের বিকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রম দেশব্যাপী পরিচালিত হলে দেশের সর্বত্র অস্তিত্বশীল ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের সুযোগ ঘটে। প্রচল আঙ্গিকগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্যে গঠনগত ও পরিবেশনাগত বিশেষ একটি ঐক্য আবিষ্কার করা সম্ভব হয়। এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঐতিহ্যবাহী নাটকগুলোকে একটি তত্ত্বসূত্রের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস অব্যাহত থাকে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এই আঙ্গিককে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী নামে অভিহিত করেন। কিন্তু সত্য এই যে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের আধুনিক কাঠামো দ্বৈতাদ্বৈতবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো উপস্থাপন করা হয়নি গ্রাম থিয়েটারের ইউনিট সংগঠনের কর্মীদের কাছে। ফলে সাধারণ কর্মীরা একটা আলো-আঁধারের অস্পষ্টতার মধ্যে অবস্থান করছেন। যা তাঁদের অভিজ্ঞতাবহির্ভূত সে বিষয়ে অনাগ্রহ জন্ম নেওয়ার তো বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। কাজেই প্রত্যেক কর্মীকে সচেতন ও সক্রিয় করতে হলে সংগঠনের আদর্শ, উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি, কর্মী হওয়ার যোগ্যতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থিয়েটার তত্ত্ব সম্পর্কেও বিস্তারিত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অন্যথায় কর্মীরা যেকোনো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের কর্মীর মতোই নামসর্বস্ব কর্মীরূপে গড়ে উঠবেনÑদলের যেকোনো প্রয়োজনে বা দুঃসময়ে তাঁর হদিস মিলবে না সংগঠনের ত্রিসীমানায়।

* গ্রাম থিয়েটারের মাধ্যমে আমরা সচেতন থিয়েটার কর্মী ও অধিকার সচেতন নাগরিক সৃষ্টি করার অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই ক্ষণে এ কথাও তো মনে রাখা জরুরি যে ব্যক্তি সামাজিক চৈতন্য দ্বারা পরিচালিত, তিনি এককভাবে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতার অধিকারী নন। তাঁর রাজনৈতিক চেতনা সমাজসম্ভূত। সামাজিক-আর্থনীতিক সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ রাজনীতি নামক শব্দের অভ্যন্তরে ধৃত। আর্থনীতিক স্তর বিন্যাস অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ রাষ্ট্রে তাঁর প্রতিপক্ষ অর্থাৎ অপর শ্রেণির সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। গ্রামীণ জোতদার কিংবা নব্য পুঁজিপতির সঙ্গে (অনৈতিকভাবে অর্জিত পুঁজির বলে) সাধারণ একজন গ্রাম থিয়েটার কর্র্মীর বিরোধ বা দ্বন্দ্বের কারণ সামাজিক নয়, আর্থনীতিক। পীড়নক্লিষ্ট এই মানুষটি প্রকৃতপক্ষে কোন রাজনীতি করবেন, কিংবা কার সঙ্গে তিনি থিয়েটার করবেন, পীড়নকারী, তাঁর সহযোগী, তাঁর ভাড়াটে পান্ডা কার সঙ্গে? জাতীয় জীবনের সংকটময় মুহূর্তে দুজন গ্রাম থিয়েটার কর্মী দুটি ভিন্ন দলের কর্মী হলে এবং সেই দল দুটি যদি পরস্পরবিরোধী আদর্শের হয়, থিয়েটার কর্মীদ্বয় অভিন্ন সংগঠনে ও অভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত হলে তাঁদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। সে ক্ষেত্রে থিয়েটারের মতো একটা সংগঠন পরিচালনা কষ্টসাধ্যকর্ম। সংগঠনে দল-উপদল সৃষ্টির অন্যতম কারণ এটি। এ ছাড়া একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠনের কর্মীদের রাজনৈতিক দর্শনটা পরিষ্কার হওয়া বাঞ্ছনীয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে তিন দশকেও স্পষ্ট হয়নি একজন গ্রাম থিয়েটার কর্মীর রাজনৈতিক দর্শন ও শ্রেণিপরিচয়-সম্পর্কিত মানদ-। বলতে পারেন আমি থিয়েটার কর্মী এটাই আমার রাজনীতি, এটাই আমার দল। আপনি অভিনেতা, আপনি নির্দেশক, আপনি নাট্যকার একটা সামাজিক পুঁজি আপনার রয়েছে, কিন্তু আমি উপর্যুক্ত কোনো পরিচয়েই পরিচিত নইÑতবে কি গ্রাম থিয়েটারে আদর্শে বিশ্বাস করার অধিকার আমার নেই? কেন নেই, সেটা বলে দেওয়া বোধ হয় জরুরি। আর তা দিতে গেলেই কর্মীর রাজনৈতিক দর্শন কী হওয়া বাঞ্ছনীয়, তা স্পষ্ট হতে পারে।

* গ্রাম থিয়েটার কোনো উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান নয়। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যক্তির আর্থনীতিক উৎপাদনের উৎস হতে পারে না। ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি যেখানে জীবনের লক্ষ্য, সেই সমাজব্যবস্থায় থিয়েটার সংগঠনের সার্বক্ষণিক কর্মী পাওয়ার চিন্তা নিতান্তই বাতুলতা। উল্লিখিত কারণেই বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার গত তিন দশকে জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও এ সংগঠনের সার্বক্ষণিক কর্মী নেই। প্রত্যেক সদস্যই সংগঠনের প্রতি স্বীয় ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা দেখাতে প্রস্তুত, কিন্তু ব্যক্তিগত পারিবারিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তাঁর পক্ষে সংগঠনকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সময় দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গ্রাম থিয়েটারের যাবতীয় কার্যক্রম ঋতুভিত্তিক। ঋতুভিত্তিক হওয়ার কারণেই অনেক সময় কোনো ইউনিট সংগঠন ভুলেই যায় হয়তো কেন্দ্রের সঙ্গে তার একটা যোগাযোগের সম্পর্ক আছে! কেন্দ্র আরও ব্যস্ততার ভারে ন্যুব্জÑযাবতীয় কর্মের অবসরে কেন্দ্রীয় পর্ষদ নেতারা পুনরায় সব সংগঠনকে স্মরণ করেন। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কেন্দ্রকেই খোঁজখবর করতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুপক্ষের যোগাযোগের সেতুটা বড় নড়বড়ে। শুধু বর্তনানেই নয়, কেন্দ্রের সঙ্গে গ্রামপর্যায়ের সংগঠনের নিয়মিত যোগাযোগ সব সময়ই রক্ষিত হয় না। এর ফলে সাংগঠনিক স্তর বিন্যাস থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক চেইন সৃষ্টি হয়নি অদ্যাবধি।

* সমালোচকের দৃষ্টিতে বিচার করলে বলতেই হয়, সংগঠনটির শৈশবত্ব ঘোচেনি অদ্যাবধি। প্রতিটি সংগঠনই নিয়মিত মঞ্চায়ন করবে। গ্রাম থিয়েটারের ইউনিট সংগঠনের জন্য নাটক নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। সব সময় তারা নির্বাচিত নাটকগুলোই মঞ্চায়ন করে না, ইচ্ছা মাফিক করে, তা-ও স্পষ্ট নয়। উপস্থাপনারীতি বা পরিবেশনারীতি বা অভিনয়পদ্ধতি নির্ধারিত ছিল ত্রিশ বছর আগে। তা অনুসৃত হচ্ছে কি না, সে তথ্য উদ্ধার করা রীতিমতো ফাইলপত্র ঘাঁটার ব্যাপার। বছর খানেক আগে কোনো এক ইউনিট সংগঠনের প্রযোজনা দেখার অভিপ্রায়ে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, তাতে বুঝতে কষ্ট হয়নি যে নামে গ্রাম থিয়েটার সংগঠন হলেও কাজেকর্মে নয়। কারণ, দলীয় সদস্যদের কোনোরূপ প্রশিক্ষণ নেই, গ্রাম থিয়েটার কী-কেন, এর উদ্দেশ্য-আদর্শ কীÑসে বিষয়ে তাঁদের ধারণা মোটেও স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় শতবর্ষী সংগঠন হলেও মূলে কোনো মঙ্গল আছে কি? যে সংগঠনে বাবা ছিলেন, আজ ছেলে কাজ করছেনÑতার দিকে তাকালেই সমস্যাটি মূর্ত হবেÑবাবা জানতেন তাঁর সংগঠনের মহান আদর্শ, কর্মপদ্ধতি, সংগ্রামের ধরন, তাঁর সংগঠনের তত্ত্ব-দর্শন। ছেলে পৈতৃক সূত্রে সংগঠন পেয়েছেন, প্রশিক্ষণটা পাননি। দোষটা তাঁকে দিই কী করে? ত্রিশ বছরেও সংগঠনটির লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হয়নি এবং লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা অনির্ধারিত এবং নির্দিষ্টকরণের কোনো পদক্ষেপ সম্ভবত এখনো গৃহীত হয়নি। যদি লক্ষ্য অর্জন উদ্দেশ্য হতো, তবে প্রত্যেক নতুন কর্মীকে আমরা প্রশিক্ষিত কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতাম, তাঁরা হতেন লক্ষ্য অর্জনের আদর্শ সৈনিক। লক্ষ্য স্থির নেই বলেই একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শ, উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি থাকার পরও গ্রাম থিয়েটার সুশৃঙ্খল, লক্ষ্যাভিমুখী একটি আন্দোলনে পরিণত হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষমতালিপ্সু বুর্জোয়া ও জনবিমুখ সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মতো বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারও একটি শৌখিন সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এ কথা আত্মসমালোচকেরÑকারণ, আমি সত্যি জানি না আমি কী চাই, কত দিনের মধ্যে চাই এবং কীভাবে চাই। সবাইকে দিয়ে উৎকৃষ্ট মানের নাটক করানোও যদি আমার লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে আমি সেই কাজটাই ঐকান্তিক প্রয়াসে করি না কেন?

* ত্রিশ বছর নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন, আঞ্চলিক সম্মেলন, বিভাগীয় ও জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে জবাবদিহিও সৃষ্টি হয়নি। এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনার জন্য অধিকাংশ সময় সাধারণ কর্মীরা অপেক্ষায় থেকেছেনÑকেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শৈথিল্যের কারণে অধিকাংশ থিয়েটার বিভিন্ন সময় নির্জীব হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে অসংকোচে এ কথা বলা যায় যে নেতৃত্বের সংকট আদ্যন্ত গ্রাম থিয়েটারে বিদ্যমান ছিল, আজও আছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফের পর কে দায়িত্ব নিয়ে দেশব্যাপী বিস্তৃত এই সংগঠনটাকে সম্মুখবর্তী করবেন? অথবা যদি কেউ এমন বলেন গ্রাম থিয়েটারের প্রয়োজন এখন আর নেই। কেন প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল, তা যখন জানি না, তবে তো প্রয়োজন আর নেই বললেই প্রচ- ধাক্কা খাই। এ অবস্থায় সংগঠনটাতে যে নেতৃত্বের সংকট বিদ্যমান, তা অনস্বীকার্য।

* বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের উদ্ভব ঘটে স্বৈরাচারী শাসনামলে। সামরিকতন্ত্র যখন সমগ্র দেশে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তখন বেগবান হয় গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রম। বিচিত্র কর্মসূচি নিয়ে এর কর্মীরা ছুটে গেছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। বাজার অর্থনীতির চাপ না থাকায় সেই ছুটে বেড়ানোর জন্য খুব বেশি আর্থিক ক্লেশ সহ্য করতে হয়নি কারও। হু হু করে বেড়েছে সংগঠনসংখ্যা। প্রাথমিক যুগে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর অনেক সংগঠনই এখন নেতৃত্বের আসনে আসীন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্বৈরাচারের পতন হওয়ার পর গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রম আর আগের গতি পায়নি। নেতিবাচক জাতীয় রাজনীতির প্রভাব গ্রাম থিয়েটারে পড়ে সবার অলক্ষে, কিন্তু বাস্তবসম্মতভাবেই। স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী চক্র সক্রিয় হওয়ার পর দেশীয় রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা পায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে ভয়াবহ এক ভবিষ্যতের আলামত রূপে চিহ্নিত হয়। সমগ্র দেশের গ্রাম থিয়েটার সংগঠনগুলোকে আবার সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নতুন নতুন কর্মসূচি দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে। কিন্তু মাঝের বিরতির সময় যেসব সংগঠন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, সেগুলো আর সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। এর কারণও সামাজিক-আর্থরাজনৈতিক। যে যুবক একদিন চৌকোণ খোলা মঞ্চে এলাকার হাজার হাজার দর্শকের সম্মুখে অভিনয়কৌশল প্রদর্শনের পুরস্কার হাততালি পেয়ে পরিতৃপ্ত হতেন, উজ্জীবিত হতেন, থিয়েটার কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হতে তিনি এখন সরকারি কিংবা বিরোধী দলের মিছিলের নেতা। বিশিষ্ট চাঁদাবাজ হয়তো, না হলে পেশিশক্তির প্রদর্শনে ব্যস্ত। না হলে মৌলবাদী সংগঠনের প্রশিক্ষণ নিয়ে রগ-কাটাকাটিতে দক্ষ হয়ে উঠছে। ফলে গ্রাম থিয়েটার নয়, কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনেই আজ আগের মতো বেগ ও আবেগ নেই। গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রম মাঝে ঝিমিয়ে না পড়লে হয়তো নিজস্ব কর্মীদের হারাতে হতো না। তাই বলা যায়, ত্রিশ বছর নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল এমনটা দাবি করা যায় না। সর্বদা সমগতিতেও তা যে অগ্রসর হয়নি, তা বলাই বাহুল্য।

* ত্রিশ বছরের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অবদান একেবারেই নগণ্য, তা বলার জো নেই। বাংলা নাটকের নিজস্ব আঙ্গিকটি নাট্যাচার্যের ব্যক্তিগত প্রয়াসের ফল এবং আধুনিক শিল্পরুচিসম্পন্ন দর্শকের সামনে তাকে পরিবেশন করার একক কৃতিত্বের দাবিদার নাসির উদ্দীন ইউসুফ, কিন্তু উল্লিখিত কাজে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অবদানকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। কারণ, তারা সরবরাহ করেছে নানা উপাত্ত। এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নাটক ও থিয়েটার শিক্ষার জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিভাগ প্রতিষ্ঠায় গ্রাম থিয়েটারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের মাধ্যমেই ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটক নাগরিক শিক্ষিত সমাজের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। গ্রাম থিয়েটার বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু খ্যাতিমান নাট্যকার, সংগঠক, তাত্ত্বিক ও সংগ্রাহক, নির্দেশক অভিনেতার জন্ম দিয়েছে। আমাদের তাবৎ শিল্প ও সাহিত্যকর্মে বাংলাদেশের জনগণ জনপদের সংস্কৃতি ও অবহেলিত পদ্মাপারের ভাষারীতির উজ্জীবন ঘটাতে পেরেছি হয়তো, কিন্তু কতটা পেরেছি তা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রতিটা ক্ষেত্রেই সফলতা কিছু নেই তা নয় কিন্তু তা পরিতৃপ্ত হওয়ার মতো নয় মোটেই। বাংলাদেশের মানুষের আত্মার স্পন্দন যেন এ দেশের নাটকে, সংগীতে, চিত্রে, ভাষ্যে, অভিনয়-অভিব্যক্তিতে, মঞ্চরূপে, নৃত্যের মুদ্রায় মূর্ত হয়, সেটাই হওয়া উচিত ছিল আমাদের ব্রত। ত্রিশ বছর ধরে অস্তিত্বশীল একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাছে নিঃসন্দেহে এটা খুব বেশি চাওয়া নয়। একই সঙ্গে রাজনীতি যেহেতু সংস্কৃতিরই অন্যতম রূপ, সেই হেতু বিনষ্ট রাজনীতির ভিতে একটা আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠনের রূপরেখা উপস্থাপনও ছিল কাম্য। কিন্তু গ্রাম থিয়েটার সেদিকে নজর দেয়নি। এ প্রসঙ্গেই বলা যায়, গ্রাম থিয়েটার বরাবরই একটি দ্বিধার মধ্য দিয়ে তার কর্মকা- পরিচালনা করেছে। দর্শনগত একটা অস্পষ্ট আগাগোড়াই ছিল এবং তাকে দূর করার কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি কখনো। কারণও অনুসন্ধান করা হয়েছে এমনটা বলা যায় না। রাজনীতি সম্পর্কে সংগঠনের অনীহার মূল সম্ভবত সেখানেই প্রোথিত। কিন্তু জাতির সাহিত্যের, সংগীতের, নাটক ও অভিনয়ের কাক্সিক্ষত রূপ নির্মাণের দায়িত্ব যে সংগঠন নিয়েছে, স্বেচ্ছায় সে কেন রাজনীতির মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে এড়িয়ে চলছে, তা আজও বোধগম্য নয়। অথচ সংগঠনে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বিজ্ঞ কর্মীর সংখ্যা একবারেই অঙ্গুলিমেয় নয়। ত্রিশ বছর পর পেছনে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলে যা কিছু দৃষ্টিপথে মূর্ত হয়, আপন আপন রং চেহারায় আপনাদের সম্মুখে এতক্ষণ তা-ই বলার চেষ্টা করেছি আন্তরিকতার সঙ্গেÑএবার বহমান বর্তমানের দিকে একবার দৃষ্টি ফেরাতে চাই।

সুধী সহকর্মী!
আমার বেতাল কথামালা আপনাদের বিরক্তি উৎপাদন করবে জানি, কিন্তু আমার যে বলা চাই। বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে আশ্চর্য সব গুণ নিয়ে দ-ায়মান। বর্তমানের দিকে তাকালে দেখবেন ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তদানের বিনিময়ে যে দেশটা বাঙালি স্বাধীন করেছে, আজ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বাবা-মা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, সন্তানকে পৃথিবীর অন্য দেশে পাঠিয়ে দেবেন ক্রীতদাস করেÑএ এক আজব রোগ। বাংলা ভাষায় কথা বলা বা লেখাপড়া করা রীতিমতো ঘৃণ্য অপকর্মে পরিণত হয়েছে অভিজাত মহলের কাছে। মাতৃভাষার প্রতি এই অনীহার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে কি না জানি না। পরধন লুণ্ঠনের প্রতিযোগীদের সংখ্যা পৃথিবীর অন্য সব দেশে মোট যা, সম্ভবত ছোট এই দেশে রয়েছে তার বেশি। পরচর্চার প্রতিযোগিতায় তাবৎ পৃথিবীকে ইতিমধ্যে হারিয়ে দিয়েছি আমরা। অনৈতিকভাবে বিত্ত, পদ, সুনাম, সম্পদ অর্জনে যে সবচেয়ে পারঙ্গম, সেই যথার্থ জাতীয় বীর। এবংবিধ অজ¯্র বিষয়ে আমরা বিশ্ববাসীকে বিস্ময়ের সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিÑসবার ওপরে বোধ হয় দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার যোগ্যতা। এই বর্তমানের পিচ্ছিল পিঠে দাঁড়াতে গিয়ে প্রত্যেক নাগরিক আজ বিপন্ন। এই বিপন্ন দশার মধ্যেই দেশব্যাপী গ্রাম থিয়েটারচর্চা অব্যাহত রয়েছে অন্য অনেক ক্রিয়াকর্মের মতোই। সর্বত্রই দেখব অপসংস্কৃতির বাঘ-নখ হৃৎপি- তাক করে আছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নতুন চেহারা জাতীয় সংস্কৃতির ওপর চেপে বসেছেÑগ্রাম থিয়েটার সংগঠনগুলো প্রতিটি স্থানেই আজ উক্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধরত। তারই ফলে সংগঠনগুলোর নির্জীব রক্তাক্ত চেহারা।

প্রিয় সহকর্মী!
* আন্তরিকতার সঙ্গে দৃষ্টি ফেরালে দেখবেন সামাজিক ক্ষয় ও অবক্ষয়ের স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গ্রাম থিয়েটার সংগঠনে। বিভিন্ন বিভাগের সক্রিয় ও সচল অনেকগুলো সংগঠন ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। কোথাও জীবিকার তাগিদে নেতৃস্থানীয় কর্মীরা অন্যত্র গমন করায় সংগঠনের ভিত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এমনটা ঘটেছে। কোথাও আগ্রহী কর্মীর অভাবে প্রতিষ্ঠাতা ঘামে-শ্রমে সৃষ্ট সংগঠনকে নিষ্ক্রিয় ও নিঃশেষ হতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। কোথাও যতেœর অভাবে হঠাৎ সবার অগোচরেই থিয়েটারটা প্রাণ হারিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নামসর্বস্ব সংগঠন এবং এক বা একাধিক কর্মীর বিরস মুখ হতাশ করে। যেসব সংগঠন অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলোতেও নাটক প্রযোজনার খুব একটা উদ্যোগ আয়োজন রয়েছে এমনটা বলা শক্ত। কিছুসংখ্যক সংগঠন আদর্শচ্যুত হয়ে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন বিভাগের কিছুসংখ্যক সংগঠন গ্রুপ থিয়েটারের সদস্যপদ গ্রহণ করেও গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেÑতাদের দ্বিধাবিভক্ত আদর্শ গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রমে নিরবচ্ছিন্ন গতি সঞ্চার করতে অপারগ। অস্তিত্বশীল সংগঠনগুলোর নতুন কর্মীরা গ্রাম থিয়েটারের মৌল উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিফ নন। ফলে সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হওয়া সত্ত্বেও আদর্শিকভাবে তিনি গ্রাম থিয়েটার কর্মী, এমন দাবির যৌক্তিকতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ। যিনি গ্রাম থিয়েটারের উদ্দেশ্য-আদর্শ সম্পর্কে অবহিত নন, তাঁর পক্ষে আর একজন আদর্শনিষ্ঠ কর্মী সৃষ্টিও সম্ভব নয়। ফলে একধরনের বন্ধ্যাত্ব ক্রমে গ্রাস করছে গ্রাম থিয়েটারের সচল সংগঠনগুলোকে। নতুন কর্মীদের অধিকাংশেরই লক্ষ্য টেলিভিশন চ্যানেল এবং গ্রাম থিয়েটারকে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্ল্যাটফর্ম মনে করেন। বলতে দ্বিধা নেই, আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্ব এবং আওয়ামী লীগ-আওয়ামী লীগ দ্বন্দ্বের জের হিসেবেও অনেক সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

* আর্থিক সচ্ছলতার জন্য কোনো কোনো সংগঠন দলীয় প্রযোজনা বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন এনজিও এবং ইউনিসেফ বা অন্য কোনো বিদেশি সংস্থা কিংবা বিদেশি সংস্থার এজেন্টদের ফরমাশি প্রচারণামূলক নাটক করে যাচ্ছে বছরব্যাপী। তারা কখনো গ্রাম থিয়েটারের নির্ধারিত প্রয়োজনা করেছে এমন দলিল নেই। এরূপ সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে।

* অধিকসংখ্যক সংগঠনই গত দুই-তিন বছরে নতুন কোনো নাটক প্রযোজনা করেনি। সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, অভিনয়কৌশল শিক্ষা, নাটক নির্দেশনা বা পা-ুলিপি রচনা বা থিয়েটারের অন্য কোনো বিষয়ে কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় সংগঠন কোনোরূপ কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে শারীরিক, মানসিক ও প্রায়োগিক কোনো দিক থেকেই তারা সংগঠনের মূল আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করার উপযোগী হয়ে গড়ে উঠছে না।
* বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের কেন্দ্রীয় নেতারা আঞ্চলিক, বিভাগীয় এবং ইউনিট সংগঠন নিয়মিত পরিদর্শন করেন না। এর ফলে সংগঠনগুলোর বাস্তব অবস্থা-সম্পর্কিত সার্বিক তথ্য যেমন কেন্দ্রের হাতে নেই, তেমনি ইউনিট সংগঠনের একজন কর্মীর কেন্দ্রীয় নেতারা এবং তাঁদের কর্মকা- সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পারস্পরিক সম্পর্কের এই ব্যবধি সাংগঠনিক কাজেও বিস্তর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব অতিক্রম করা সম্ভব না হলে ধীবে ধীরে থিয়েটার সংগঠনগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কখনো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না সেই নামের কোনো মানুষ ও সংগঠন।

প্রিয় সহকর্মী!
অগোছালো আমার বক্তব্য এতক্ষণ শোনার জন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এ নিবন্ধের কোনো নির্দিষ্ট উপসংহার নেই। কারণ, প্রতিটি প্রসঙ্গ আলোচনায় আমার সার কথাগুলোও বলার প্রয়াস পেয়েছি। সমস্যাগুলো অজ্ঞাত নয় কারও। সমাধান সংগঠনকে নতুন কর্মপদ্ধতির আলোকে এই সময়ের বাস্তব সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের ভিত্তিতে সক্রিয় করার মধ্যে নিহিত। অর্থাৎ ছুঁই ছুঁই ভাব নয়, মরণপণ সংগ্রামের স্তর থেকে দেখাই জরুরি। ধন্যবাদ আপনাদের।

০৯ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ বাং, ২৩ নভেম্বর ২০১২ খ্রি.
সেমিনার কক্ষ, জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি
আয়োজনে : বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ৩০ বছর উপলক্ষে পঠিত

Advertisements

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার : একটি পর্যবেক্ষণ

রশীদ হারুন

মুখবন্ধ
জন্ম সালের বিচারে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বর্তমান (২০১২) বয়স একত্রিশ। বয়সের হিসাবে মধ্য-যৌবন কাল। কবির ভাষায় ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। কিন্তু বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার যুদ্ধের জন্যই জন্ম নিয়েছে এবং জন্মক্ষণ থেকেই এক অদৃশ্য অথচ অমোঘ শক্তির বিরুদ্ধে অনবরত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এক সমুদ্রবক্ষ স্বপ্ন আর পর্বতশিখর স্পর্শী আকাঙ্ক্ষার দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে একদা এক নির্জন পশ্চাৎপদ গ্রামের মাঘী পূর্ণিমার কুয়াশা চাদর মোড়া রজনীতে অনুজ্জ্বল হ্যাজাক লণ্ঠনের আলোয় যে সংগঠনের বীজ উপ্ত হয়েছিল সে বীজ থেকে জন্ম নেয়া ‘গ্রাম থিয়েটার’ বৃক্ষ এখন কাণ্ড-শাখা-প্রশাখা-পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়ে বিশাল মহীরূহ রূপে দাঁড়িয়ে আছে। এই বৃক্ষ এখন ছয়টি কাণ্ড (বিভাগ), ছত্রিশটি শাখা-কাণ্ড (অঞ্চল), দ্বিশতাধিক প্রশাখা (ইউনিট সংগঠন) এবং প্রায় দশ সহস্রাধিক পত্রপল্লব (সংগঠন-কর্মী) নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বাতন্ত্র্য অথচ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দীপ্যমান।

আশির দশকের অস্থির বিভ্রান্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতার হতাশা, অর্থনৈতিক ভষ্মস্তুপ, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্মীয় প্রপাগাণ্ডার লেবাসে মৌলবাদের মাথাচাড়া আর সাংস্কৃতিক পরিচিতি সংকট সৃজনের অপ্রপ্রয়াসের কালে জন্ম নিয়েছে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার শুধুমাত্র একটি আন্দোলন বা মতবাদ নয়, এটি এখন একটি সাংগঠনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নন্দনতাত্ত্বিক দর্শনও বটে। আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের মূল্যায়ন এখন কেবলমাত্র এর আদর্শ-উদ্দেশ্য বা কর্মপরিধির আলোকে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এর উদ্ভব বা সূচনাকালের পটভূমিসহ সৃজন ও বিকাশের ইতিহাস, তত্ত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিচিতি, কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল, কার্যক্রমের বিস্তার ও অর্জন, নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনার স্বরূপ অন্বেষণ এবং সমস্যা-সংকট ও সম্ভাবনা ইত্যাদি নিরূপণ করা ।

১. বাঙলানাট্য ও গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠার পটভূমি
বাঙলা নাট্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের। বিশেষজ্ঞের মতে ‘আমাদের দেশের নাটক এই জনপদের চিরায়ত শিল্পীরীতির স্বাভাবিকতায় বির্বতিত হয়েছে।’১ বাঙলা নাট্যের অজস্র আঙ্গিক যেমন গীতিকা, পাঁচালি, লীলা, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, অষ্টকগান, গাজীরগান, জারি, সঙ, ভাসান, মাদারগান, কুষাণ, ঢপযাত্রা, পুতুলনাট্য ইত্যাদি নানা বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন পূর্বক সহস্র বৎসর ধরে নাটমন্দির, আঙ্গিনা, উঠান, বৃক্ষতল কিংবা চৌকোণ, বৃত্তাকার ভূমিসমতল আসরে আসরে বাহিত হয়েছে। তবে এসকল ঐতিহ্যিক পরিবেশনা দেহমনে সম্মিলিত অথচ ‘অদ্বৈতঝঙ্কারে বিদ্যমান।’ দেখা যায় আমাদের চিরায়ত ধারার নাট্য একাধারে নৃত্য, গীত ও কাব্যকে করেছে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং সে সকল জীবন ও ধর্মাচরণের অনুসঙ্গরূপে পরিপুষ্ট হয়েছে আসরে আসরে। অর্থাৎ ‘আমাদের লোক জীবনের কৃত্য ও রুচিকে অবলম্বন করেই নাটকের এক একটি বিষয় ও নাট্যরীতির জন্ম হয়েছে।’২ তাইতো বলা হয় এই, ‘জনপদের নাটক এসেছে কৃত্যের ছদ্মবেশে।’৩
বিশেষজ্ঞগণ ইতোমধ্যে ভরতকৃত নাট্যশাস্ত্র-এ ‘ওড্র-মাগধী’ নাট্য প্রবৃত্তির ব্যাখ্যান্তে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ‘প্রাচীন বাঙলার নিজস্ব নাট্যরীতির অস্তিত্ব অষ্টম শতকের পূর্বেও বিদ্যমান ছিল।’৪ তবে এ অঞ্চলের নাটক শুধুমাত্র পাশ্চাত্যের ‘চরিত্রাভিনয় রীতির সীমানায় আবদ্ধ নয়।’ বাঙলা নাট্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মৌখিক রীতিতে সৃজ্য, আঙ্গিক ও বর্ণনাধর্মী কাব্যিক অভিনয় কৌশলে পরিবেশনা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদে (৯ম-১১শ শতক) ধৃত ‘বুদ্ধনাটক’ যে নৃত্য ও সঙ্গীতের অদ্বৈত কলাসঙ্গমে পরিবেশিত হতো তা যুক্তি-প্রামাণ্যসহ বিশ্লেষণপূর্বক প্রাচীন বাঙলার নাট্যরীতির একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন গবেষক।৫ এছাড়া পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে প্রাপ্ত পোড়ামাটির চিত্রফলক (৭ম-১৩শ শতক) ইত্যাদির আলোকে সেকালের নৃত্য, নাট্যাভিনয় প্রভৃতির ‘লোকায়ত ধারা’র পরিচয় চিহ্নিত করা হয়েছে।৬ অনুরূপভাবে বাঙলানাট্যের অস্তিত্ব সম্পর্কিত নানান তথ্য, নাট্যনমুনা বিচিত্র নাট্যআঙ্গিকের স্বরূপ এবং তাদের পরিবেশনারীতির আলোকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলা নাট্যের ইতিহাস সৃজনের প্রয়াস পেয়েছেন গবেষক ‘মধ্যযুগের বাঙলানাট্য’ শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থে। বর্ণিত গবেষণা-গ্রন্থ এবং পাঠপর্যায়ে লব্ধ বিবিধ নাট্য নমুনার আলোকে এতদিনে নিঃসন্দেহ হওয়া গেছে বাঙলা নাট্যের সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে । বলা যায় বাঙলানাট্য পেয়েছে শেকড়ের সন্ধান।
উল্লেখ্য বাঙলা নাট্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কীত উপর্যুক্ত প্রামাণ্য-তথ্যাদি এবং মন্তব্যসমূহ সম্পর্কে আমরা অবহিত হয়েছি মাত্র কিছুদিন পূর্বে গত শতকের নব্বই দর্শকের মাঝামাঝি সময় থেকে। এর কারণটি অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এতকাল প্রচলিত ছিল, বাঙলানাটক আধুনিক কালের সৃষ্টি৭ এবং ইংরেজি নাটক, বিশেষত সেক্সপীয়রের নাটকের প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফলে বাঙলানাটকের সর্বপ্রথম উৎপত্তি হয়েছে।৮ এছাড়া বলা হতো গেরাসিম স্তেপানভিচ লিয়েবেদেফ নামক জনৈক রুশ নাগরিককে বাংলার প্রথম নাট্যমঞ্চ ও বাঙলানাটকের প্রতিষ্ঠাতা।৯ কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ তো তথাকথিত ‘সত্যের দাবি’তে তাঁকে বাঙলা নাটকের ‘জনক’ হিসাবে স্বীকৃতিও দিয়েছেন।১০ এমনকি লিয়েবেদেফ প্রতিষ্ঠিত Bengali Theatre (১৭৯৫)-এ মঞ্চায়িত নাটককে প্রথম বাঙলানাট্য মঞ্চায়নের কাল বিবেচনা করে ১৮৯৫ সালে বাঙলানাট্য মঞ্চের শতবর্ষ এবং ১৯৯৫ সালে পালিত হল দ্বিশত বর্ষ পূর্তি। এতদোপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে নানা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাট্য প্রযোজনা এবং সাময়িকী প্রকাশনা, ক্রোড়পত্র রচনা ইত্যাদি।
বস্তুত পক্ষে দু’শ বছর পূর্বে পাশ্চাত্য ধারার ঘেরাটোপ মঞ্চ অর্থাৎ প্রসেনিয়াম মঞ্চ এবং পঞ্চাঙ্করীতির সংলাপ সর্বস্ব চরিত্র নির্ভর বাস্তব ধারার নাট্যচর্চাকে স্বীয়করণের আপ্রাণ চেষ্টায় আপ্লুত হয়ে রইল এদেশের নাট্যচর্চা। ঐ উন্মূল ধারাকে, সাহেবী ঢংয়ের নাট্যধারাকে ‘বাঙলা’ করণের অকান্ত চেষ্টা করেও সফলতা লাভের পরিমাণ যৎসামান্য। এ প্রসঙ্গে বাঙলা ভাষার অন্যতম কবি জসিমউদ্দীনের বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে- ‘গিরিশচন্দ্র হইতে আরম্ভ করিয়া রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বহু প্রতিভাবান লেখক বাঙলায় পাশ্চাত্য ধরনের নাটক লিখিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদের কাহারও চেষ্টা সাফল্যম-িত হয় নাই। বাংলার নাট্যকার তাঁর প্রতিভাকে বঙ্গদেশের চতুর্সীমার বাহিরে লইয়া যাইতে পারেন নাই।’ তাঁর মতে, ‘ভাল নাটক আমাদের দেশে হয় নাই।’ তাহার কারণ, আমাদের নাট্যকারেরা আমাদের দেশের ভাবধারার সঙ্গে মিশাইয়া নাটক রচনা করিতে প্রয়াস পান নাই। তাঁহারা ইউরোপের মতন নাটক রচনা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। নকল কখনও আসলের কাছে যাইয়া সমান আসন দাবি করিতে পারে না।’১১ বাস্তবিক পক্ষে তা-ই হয়েছে। পেশাদার থিয়েটার, সৌখিন নাট্যচর্চা কিংবা গ্রুপ থিয়েটার চর্চার ব্যানারে যে সকল নাটক রচিত-অনূদিত-অভিনীত হয়েছে, তাতে আর যা-ই হোক বাংলাদেশের তথা বাঙলানাট্যের কোনো বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তদুপরি রাজনৈতিক পালাবদলে রাষ্ট্রসীমা, জাতিত্ব, নাগরিকত্ব ইত্যাদির নানা ঘূর্ণাবর্তে শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ন্যায় নাট্যশিল্পও হয়েছে বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট। নানা সময়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিংবা জনজাগরণের মাধ্যম রূপে নাটক বহুল ব্যবহৃত হলেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সূচক, অর্থাৎ বাঙলানাট্যের স্বতন্ত্র কোনো রূপ দাঁড়ায় নি। এমনকি ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে অসাধারণ নাট্য প্রয়াস কবর (১৯৫৩) রচিত হয়েছে, তার আঙ্গিক গড়নে প্রবাহমান ছিল পাশ্চাত্যের নাট্য শৈলী। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যচর্চার সূচনাও হয়েছিল ঐ প্রচলিত পাশ্চাত্যধারার অনুসরণে। যদিও যুদ্ধোত্তর সংকটময় সময়ে হতাশা-বঞ্ছনা-ক্ষোভ-যন্ত্রণা প্রকাশ এবং একই সঙ্গে মানবিক-সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের কথা প্রকাশ করার নিমিত্তে বহুসংখ্যক যুদ্ধফেরৎ সাহসী মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র ফেলে নাটক ও মঞ্চকে বেছে নিয়েছিল। যুদ্ধের অমিত তেজে দীপ্ত করে তুলতে চেয়েছে বাংলাদেশের নাটক ও মঞ্চকে। ‘অস্ত্র ছেড়ে মঞ্চে নেমেছি’ এরকম শ্লোগান চেতনায় লালন করে যুদ্ধবিজয়ী যোদ্ধারা অবতীর্ণ হন নাট্যমঞ্চে। স্বাধীনতা লাভের দু’বছরের মধ্যে এদেশে সৃষ্টি হয়েছে নতুন কয়েকটি নাট্যদল। যেমন, আরণ্যক (১৯৭২), থিয়েটার (১৯৭২), নাট্যচক্র (১৯৭২), বহুবচন (১৯৭২), ঢাকা থিয়েটার (১৯৭৩), থিয়েটার ৭৩ (চট্টগ্রাম ১৯৭৩) প্রভৃতি। উল্লেখ্য, সংগঠকদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী। সংগঠকদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ গ্রুপ থিয়েটার ভিত্তিক নাট্যচর্চার প্রেরণাটি তাঁরা সঞ্চার করেছেন মুক্তযুদ্ধ চলাকালে কলকাতার নিয়মিত নাট্যচর্চার প্রত্যক্ষণ অভিজ্ঞতা থেকে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অন্তরে লালন করে নাট্যের বিষয়বস্তু ও মঞ্চভাবনার ক্ষেত্রে সঞ্চারিত হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা। বলা হয়ে থাকে, ‘মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে বাংলাদেশের সাহিত্যের যে শাখাটি সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ ও বিকর্শিত হয়েছে, নিঃসন্দেহে তা নাটক।’১২ স্বাধীনতার চেতনা বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের মধ্যে নবতরঙ্গের সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার চেতনাকে অর্থবহ করে তোলার অন্তর্গত প্রেরণায় নাট্যকর্মীরা এগিয়ে এলেন নতুন উদ্যমে। ফলে দেশ-কালের চাহিদার আলোকে নির্মিত হতে থাকলো নতুন নাটক, আবিভূত হলো নতুন নতুন সংগঠন, নতুন নাট্যকার। সময়ের দাবিতে এদেশের নাটকের বিষয় হয়ে উঠলো মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তযুদ্ধ পরবর্তী সমাজমানস। সমকালীন সমাজ, সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানুষের হতাশা-বঞ্চনা, আনন্দ-উল্লাস ইত্যাদি বিষয়বস্তু রূপে স্থান পেল রচনায়, অভিনয়ে, প্রযোজনায়। তবে একথা মান্য যে, মুক্তযুদ্ধকালীন সময় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও যে-সব নাটক রচিত ও মঞ্চায়িত হয়েছে, তাতে প্রাধান্য পেয়েছে আবেগ; মনন বা শিল্পকুশলতা নয়। বিজ্ঞজনদের অভিমত হচ্ছে, ‘স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের নাট্যচর্চার একটি তীব্রতম প্রবাহ লক্ষ্য করা গেলেও তা আপাত চমকে যতখানি আলোড়নে সমর্থ, নাট্যিক গুণাগুণের যথাযথ প্রতিফলনে ততখানি নয়। বিশেষত টেকনিক্যাল প্রয়োগনিপুণতার দিকে বর্তমান নাট্যকারদের আগ্রহ অত্যন্ত বেশী বলেই মনে হয়।’১৩ এ বিষয়ে দায়ী করা হয়েছে যে, এসকল নবীন নাট্যকারণগণ নাট্যরচনার মৌলিক আদর্শ নির্ণায়নে হয়েছেন ব্যর্থ এবং তাঁরা পূর্বসুরীদের অবিবেচনা প্রসূত পন্থার অনুসারী হয়ে ‘দুঃখজনক পরিণতি অভিমুখী’। সুধীজনের মতে, ‘তরুণদের শক্তি আছে, কিন্তু দিক নির্ণয়ের স্থিরতা নেই। অনুশীলন আছে, কিন্তু আদর্শ-নির্ণায়নের উৎসাহ নেই।১৪ এক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যতিক্রম ‘ঢাকা থিয়েটার’ (প্রতিষ্ঠা জুলাই ১৯৭৩) এবং নাট্যকার সেলিম আল দীন।
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যচক্র’ নাম দিয়ে আয়োজন করে ছাত্র-ছাত্রী রচিত অভিনীত ও নির্দেশিত আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতা। নতুন আঙ্গিক, রূপক-প্রতীকের প্রাধান্য এবং প্রতিবাদ ও আশার বাণী তুলে ধরা হলো নব নাট্য-পরিবেশনায়। সূচনা হলো নতুন ধারার নাট্যচর্চা। এই প্রতিযোগিতায় মঞ্চস্থ হয় হাবিবুল হাসান রচিত সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ, আল মনসুর রচিত বিদায় মোনালিসা, শাহানুর খান-এর পেন্ডুলামে খুন, আখতার কমলের রংহীন সিগন্যাল, আনোয়ার তালুকদার রচিত উৎস থেকে সমুদ্র, সেলিম আল দীন রচিত জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন প্রভৃতি নাটক। এসকল নাটক মঞ্চায়ণ ও নির্দেশনার সাথে নাট্যকারগণ ছাড়াও জড়িত ছিলেন ম. হামিদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সালেক খান, কামাল উদ্দিন নীলু, নিরঞ্জন অধিকারী প্রমুখ। উল্লেখ্য, এঁরা প্রায় সকলেই কোনো কোনো ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ১৯৭২-’৭৩ কাল পরিধিতে প্রতিষ্ঠিত পূর্বোক্ত নাট্যদলসমূহের মূল প্রেরণায় ক্রিয়াশীল ছিল উক্ত ব্যক্তিবর্গ। জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন এবং সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিগণ নাটক দুটির মঞ্চায়নে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মী সে সময় একত্রিত হয়ে হয়েছিল যারা পরবর্তীকালে জড়িত ছিল ঢাকা থিয়েটার গঠনে। এই একত্রিত হওয়াটা এদেশের নাটকের জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা এ জন্য যে- চলতি বাঙলা নাটকের এবং এর মঞ্চরূপায়নের প্রতি বীতশ্রদ্ধ সেই তরুণরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি নাট্যদল সৃষ্টির ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছায়।
আর সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ‘নাট্যচক্র’কে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর থেকে বাইরে নিয়ে আসার মানসে নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সেলিম আল দীন, আল মনসুর, হাবিবুল হাসান, ম. হামিদ, কাজী শাজাহান ববি, আব্দুল কাদের, নরেশ ভূঁইয়া, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ১৯৭৩ সালের ২৯ জুলাই গঠন করেন ‘ঢাকা থিয়েটার’। শুরুতে ঢাকা থিয়েটারের ঘোষণা ছিল ‘আমাদের নাটক প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তের, প্রতিভগ্নাংশে। আমরা কিছু স্বপরিচালিত, উত্তপ্ত, বন্ধনহীন তরুণ পরিচালকহীন একাত্মতায় একত্রিত ঢাকা থিয়েটারে। আমরা সৌখিন, কিন্তু সচেতন, অবিবেচক নই কিন্তু অভিজ্ঞও নই। প্রতিজ্ঞায় অটল, ভবিষ্যত দ্রষ্টা নই। ধমনীতে বহন করি প্রাগৈতিহাসিক দাঁতাল ম্যামথের প্রতিরোধ’।১৫
শুরুতে ঢাকা থিয়েটার আরও বলেছিল, ‘আমরা সৎ সমাজ চাই। নাটকের মাধ্যমে আমরা সৎ সমাজের বক্তব্য রাখবো। নাটকে সুস্থ বক্তব্য থাকবে শিল্পসম্মত হবে। বাংলাদেশের লেখা নাটক করবো।’ উপর্যুক্ত অঙ্গীকার আর দেশীয় নাট্যরীতি সৃষ্টির সাধনায় দলটি যাত্রা শুরু করে সেলিম আল দীন রচিত ব্যাঙ্গাত্মক নাটক সংবাদ কার্টুন (১৯৭৩) দিয়ে। অতঃপর মুনতাসীর ফ্যান্টাসী (১৯৭৫), চর কাঁকড়ার ডক্যুমেন্টরি (১৯৭৭, বাংলাদেশের প্রথম পথনাটক), কসাই (১৯৭৭), শকুন্তলা (১৯৭৮), ফণিমনসা (১৯৮০), কিত্তনখোলা (রচনা ১৯৭৮-৮১) প্রভৃতি প্রযোজনা নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকা থিয়েটার পূর্ণ করে দশ বছর অর্থাৎ এক দশক (১৯৮১)। অতিক্রান্ত সময়কে ঢাকা থিয়েটার বলেছে ‘মঞ্চ সাধানার’ কাল। তারা মনে করে মাটির গভীরে জল কাদার সঙ্গে লেগেছে তাদের শেকড়। মূলত সেলিম আল দীন রচিত এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ কর্তৃক নির্দেশিত কিত্তনখোলা উন্মোচন করে দিয়েছে ‘ঢাকা থিয়েটারের বৃহৎজীবনের মহাকাব্যিক পরিম-লের সুবৃহৎ দরোজা’। বলা চলে এ নাট্য ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের যুগদুর্লভ নমুনা। অজস্র চরিত্র, গ্রাম স্থানের বি¯তৃত মঞ্চ মিছিল কিত্তনখোলা ’। এ নাটকের আঙ্গিক, বক্তব্য আয়তন সমগ্র বাংলা নাটকের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। মধ্যযুগের বাঙলা নাটকের সঙ্গীত ও বর্ণনারীতির সঙ্গে এ নাটকে মিশ্রিত হয়েছে সে কালের শিল্প সমৃদ্ধ উপাখ্যানের কাঠামো। বস্তুত বলা যায়, কিত্তনখোলা মঞ্চায়নের মধ্যদিয়ে বাঙলা নাট্যের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। কিত্তনখোলা নাটকের পরিচিতি পুস্তিকায় ঢাকা থিয়েটার তাদের অভীপ্সা ও প্রত্যয়কে আরও শাণিত করে উচ্চারণ করে, ‘বাংলাদেশ একটি সংগ্রাম ক্ষুব্ধ অকুতোভয় জনপদের নাম। যুদ্ধ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে এই জনপদ সমুন্নত জীবনের আকাক্সক্ষাকে প্রজ্জলিত করেছে তার সামুদ্রিক দুই চোখে। এই দেশ, তার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি সবকিছুকে আমরা সম্মান করি। পদ্মা, মেঘনা, তিস্তা, আত্রাই, ধরলার কুলে কুলে নামহীন গোত্রহীন মানুষের সংগ্রামী জীবন হোক আমাদের নাটকের বিষয়বস্তু। ঢাকা থিয়েটার এদেশের নাটকের প্রকৃত প্রবাহটি সৃষ্টি করতে চায়।’ তারা আরো ঘোষণা করে, ‘আমরা দেশজ আঙ্গিকের স্পর্শে রচিত নিগূঢ় শিল্পবোধের দ্বারা সৃষ্ট নাটক ও নাট্য চর্চায় এবং বাংলাদেশের নাটক মঞ্চায়নে বিশ্বাসী।’ এক দশক ধরে অপরাপর নাট্যদলগুলোর ন্যায় শহর কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা করার পর ঢাকা থিয়েটারও এ সময় বেরিয়ে পড়ে ‘আদি বাঙলা মাতৃকার উৎসমূলে’র সন্ধানে। ‘দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু’ সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে মেলাপত্তন ও নাটকের দল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ পূর্বক ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে হাঁক দেন- ‘গ্রামে চলো – গ্রামে চলো’। সৃষ্টি হলো জাতীয় নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণের লক্ষ্যে, শেকড়ের সন্ধানে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’ নামক কালজয়ী মহা সংগঠন।

২. সৃষ্টি কথা
একথা পূর্বেই বলা হয়েছে যে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে মূলত শুরু হয় বাংলাদেশে নতুন ধারার নাট্যচর্চা। রক্তঝরানো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লব্ধ স্বাধীনতার ‘সোনালী ফসল’ রূপে বিবেচ্য হয় আজকের নাট্যচর্চা। কিন্তু ১৯৭৫-র ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর এদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে যে অশুভ কালো ছায়া নেমে আসে, তার থেকে নাটকও রেহাই পায় নি। তদুপরি ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিলে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সরকারী দল পঞ্চম সংশোধনী পাশ করার মাধ্যমে এই দেশ ও জাতির ভাগ্যে নিয়ে আসে এক অভিশাপ; সূচিত হয় একটি কলঙ্কময় অধ্যায়ের। উক্ত সংশোধনী দ্বারা বৈধতা দেয়া হয় জাতির পিতাসহ অন্যান্যে হত্যাকা-কে, পুরস্কৃত ও পুণর্বাসিত করা হয় খুনিদের, প্রতিষ্ঠা করা হয় জামায়াত মুসলীম লীগসহ স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী ঘাতক-দালালদের। সংবিধান সংশোধনী করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে ফেলে ইসলামকে করা হয় রাষ্ট্রধর্ম। ছেঁটে ফেলা হয় সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি। রাষ্ট্রক্ষমতায় মন্ত্রীত্বে বসানো হয় স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারীদের। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে স্বার্থপরতা, সুবিধাগ্রহণে নির্লজ্জ আচরণ, নীতি-নৈতিকতাহীনতা ইত্যাদি দেশের মানুষকে করে তোলে হতাশ। এছাড়া অর্থনীতির ক্ষেত্রে জাতীয়করণ নীতি পরিহার করে বেসরকারী খাতকে অগ্রাধিকার প্রদানের ফলে মানুষের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আশংকাজনক হারে বেড়ে যায়। ১৯৮১ সালে দেশের জনসংখ্যার ৮০% চলে যায় দারিদ্র সীমার নীচে। ১৯৭৪ সালে দেশে যেখানে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ২ জন, সেখানে ১৯৮১ সালে দেশের কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০ জন।
১৯৭৫-১৯৮১ সময় কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরণের পরিবর্তনসমূহ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে এ সময়কার নাট্যচর্চাকে। বিশেষ করে মৌলবাদের উত্থান, স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের পুর্নবাসন ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠান এবং জাতীয়বাদের বির্তক সৃজন প্রভৃতি বাঙালির জীবনে যেমন ব্যাপক পরিবর্তন আনে, বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ক্ষেত্রেও তেমনি পরিদৃষ্ট হয় পরিবর্তন। নতুন নতুন নাট্যদল গাঠিত হয়। নাট্য বিষয়বস্তুতে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-ঘৃণা-ক্ষোভ ইত্যাদির প্রাধান্য পেতে থাকে। মঞ্চের পাশাপাশি প্রতিবাদী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ পথ নাটক প্রদর্শন, পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নাট্য প্রযোজনার মান উন্নয়ন (উল্লেখ্য ১৯৭৮-৮১ সালের মধ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন নাট্যকর্মী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন), নাটককে গণমানুষের ভাষা হিসাবে আন্দোলনে পর্যবসিত করা প্রভৃতি কর্মকা-ও ব্যাপক ভাবে শুরু হয় নাট্যকর্মীদের ‘কমিটমেন্টে’র জায়গা থেকে। ১৯৭৯ সালে ঢাকা (১৫-২৭ এপ্রিল) এবং চট্টগ্রামে (১৫-২১ ডিসেম্বর) শহরের দলগুলো নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গ্রুপ থিয়েটার উৎসব। বীজ উপ্ত হয় বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের। ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বর রামেন্দু মজুমদারকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’। শুরুতে সংগঠন ছিল ৬৭। ঢাকা মহানগরের ছিল ২১ টি। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় সূচনা হয় নতুন ধারা, নাট্যচর্চা রূপান্তরিত হয় নাট্য আন্দোলনে। দেশব্যাপী নাট্যচর্চায় ব্যাপৃত সংগঠন ও কর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় সেতুবন্ধন। ঢাকা থিয়েটার এবং এর কর্মী সংগঠকরা শুরু থেকে সম্পৃক্ত ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশ’-এর সাথে। নাসির উদ্দীন ইউসুফ উক্ত ফেডারেশনের অন্যতম সংগঠক।
স্বৈরাচারের উত্থান, স্বাধীনতা বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, রাজনৈতিক দল ও নেতারা বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধাঁয় দিশাহারা ইত্যাদি অবস্থা দৃষ্টে মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্যসংগঠক নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিলেন ক্ষুদ্ধ মর্মাহত। ঢাকা থিয়েটারের কর্মীরা মুনতাসীর ফ্যান্টাসী, কসাই, শকুন্তলার সাফল্যের পর কিত্তনখোলা প্রযোজনা প্রস্তুতি চলছে। দেশজ, মৌলিক নাটক রচনা ও মঞ্চায়ন এবং পরজীবী নাট্যচর্চা পরিহার পূর্বক আবহমান কালের বাঙলা নাট্যের প্রকৃত পথ সৃজন ও আমাদের চিরায়ত লোকায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা অন্বেষণে প্রতিশ্র”তিবদ্ধ ঢাকা থিয়েটার কিত্তনখোলা নিয়ে দারুন উত্তেজিত, রোমঞ্চিত।
ঢাকায় চলছে কিত্তনখোলার মহড়া, সেলিম আল দীন তালুকনগরে। উল্লেখ্য নাট্যকার সেলিম আল দীনের শ্বশুরবাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার তালুকনগর গ্রামে। যমুনার তীরবর্তী এই ভূখন্ড এক ফসলি। প্রতিবছরই যমুনার নানা শাখা-নদী, খাল ইত্যাদির স্রোতে প্রতি বর্ষায় দৌলতপুরের বি¯তৃত এলাকা হয় প্লাবিত। ফলে একদিকে যেমন পলি জমে উর্বর করে তোলে ফসলি জমিকে পাশাপাশি ভাসিয়ে নিয়ে যায় বালিমাটির পথ-ঘাট। ফলে বর্ষায় নৌকা এবং শীত বা শুকনা মৌসুমে পায়ে হাঁটা বা অংশত ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত ঐ অঞ্চলের নৈমত্তিক ব্যাপার। গ্রামের জনপ্রিয় তরুণ নাট্যকর্মী মো. আমিনুর রহমান মানিককে ডেকে কথা বললেন সেলিম আল দীন (২৭ ডিসেম্বর ১৯৮০)।১৬ গ্রামের নাট্যচর্চা, মেলা, শহরের নাটক, ঢাকা থিয়েটার ইত্যাদি নানা বিষয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনার উপান্তে মানিককে ঢাকায় নাটক দেখা এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফের সাথে কথা বলার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া সাধক মরহুম আজহার আলী বয়াতী রচিত নানা জনের নিকট ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সহস্রাধিক গান সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নিমিত্তে মানিককে দিক নির্দেশনা দেয়া হলো। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮০ তারিখ বিকাল চারটায় তালুকনগর মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সেলিম আল দীনের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় গঠন করা হয় নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সেলিম আল দীন সহ গ্রামের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ সিদ্দিকুর রমহান, ম. আ. হালিম প্রমুখকে উপদেষ্টা এবং আমিনুর রহমান মানিককে সভাপতি করে ৬০ সদস্য বিশিষ্ট ‘শাহ আজহার বয়াতী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’। বলা যায় এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই পরবর্তীকালে সৃষ্ট ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে’র অনানুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।
উপর্যুক্ত ঘটনার অল্পদিনের মধ্যেই সেলিম আল দীন হাতে লেখা চিরকুট মারফৎ তৎকালীন বাংলা বিভাগের ছাত্র এবং পরবর্তীকালে গ্রাম থিয়েটারের জনপ্রিয় নাট্যকার সালাম সাকলাইনকে দিয়ে ঢাকায় ডেকে পাঠান মানিককে। ঢাকায় জনাব নাসির উদ্দীন ইউসুফের সভাপতিত্বে সেগুনবাগিচার ‘এ্যাডবেস্ট’ বিজ্ঞাপনী সংস্থার অফিসে অনুষ্ঠিত হয় এক সভা। জানা যায় উক্ত সভায় উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ূন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, কামাল বায়োজিদ, কৌশিক সাহা, শতদল বড়ূয়া বিলু, আমিরুল ইসলাম টিপু প্রমুখ। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে ছিল
১. পরের বছর (১৯৮২) তালুকনগর মেলায় ঢাকা থিয়েটার নাটক নিয়ে অংশ নেবে;
২. বর্তমান বছরের (১৯৮১) মেলায় খরচ নির্বাহের জন্য ঢাকা থিয়েটার ২৫০ টাকা সহায়তা দেবে;
৩. ১৫ দিনের মধ্যে, মেলা অনুষ্ঠানের আগে (৬ মাঘ, ১৯ জানুয়ারি ১৯৮১) ‘তালুকনগর থিয়েটার’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে ঢাকা থিয়েটারের নিকট কার্যবিবরণী পাঠাতে হবে;
৪. ‘তালুকনগর থিয়েটারে’র নিচে ব্রাকেটে লিখতে হবে ‘ঢাকা থিয়েটারের একটি অঙ্গ সংগঠন’।

বর্ণিত সিদ্ধান্তের আলোকে ১৫ জানুয়ারি ১৯৮১ তারিখে ৫৯ জন সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় ‘তালুকনগর থিয়েটার’। সংগঠিত হলো ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম গ্রামীণ সংগঠন ‘তালুকনগর থিয়েটার’ নতুন ইতিহাসের সূচনা করলো। যদিও তখন পর্যন্ত ‘গ্রাম থিয়েটার’ বলতে কোনো সংগঠন কাঠামো দাঁড়ায় নি। ঢাকা থিয়েটারের গ্রামীণ অঙ্গ সংগঠন হিসাবেই ‘তালুকনগর থিয়েটার’র যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে ‘তালুকনগর থিয়েটার’ মর্যাদা লাভ করেছে গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সংগঠন রূপে। এছাড়া সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমিনুর রহমান মানিক অর্জন করেছেন গ্রাম থিয়েটারের প্রথম কর্মী বা সদস্যের সম্মান। স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি আমিনুর রহমান পরিবার পরিজনসহ এখনো তালুকনগর থিয়েটারের অকান্ত পরশ্রমী প্রধান ব্যক্তিত্ব। ৬ মাঘ ১৩৮৭, ১৯ জানুয়ারি ১৯৮১ ঢাকা থিয়েটারের সহযোগিতায় তালুকনগর থিয়েটার প্রথম আয়োজন করে ‘আজহার বয়াতীর মাঘী মেলা’। ঢাকা থিয়েটার ও তালুকনগর থিয়েটারের সহযোগিতায় মেলা ফিরে পেলো নতুন প্রাণ। ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে’র মূল লক্ষ্যের অন্যতম গ্রামীণ মেলার পুনর্জ্জীবন বা নতুন মেলার আয়োজনের কার্যক্রম এভাবেই শুরু হয়েছিল তালুকনগরে।
পুরো ১৯৮১ সাল ধরে চলে প্রস্তুতি। গ্রামীণ নাটক ও মেলা সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য ঢাকা থিয়েটার সমমনা নাট্যদলগুলোকে আহ্বান জানায়। প্রারম্ভিক একজন সংগঠকের স্মৃতিচারণায় জানা যায় যে, ১৯৮১ সালে প্রথম দিকে নাট্যকার সেলিম আল দীন ‘সংলাপ-ফেনী’র সচিবের (নারায়ণ নাগ) সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন, শহুরে নাট্যচর্চাকে গ্রামাভিমুখী করার বিষয় নিয়ে। প্রায় বছর খানেক আলাপ আলোচনার পর ৬ জানুয়ারি ১৯৮২ তারিখে সেলিম আল দীন জানান ‘ফেনীর সংলাপ’, চট্টগ্রামের ‘অরিন্দম’, ‘পাবনা থিয়েটার’, ‘বগুড়া থিয়েটার’, ‘টাঙ্গাইলের নাট্যবিতান’, ‘ঢাকা থিয়েটার’ এ ছ’টি দল ছ’টি জেলায় একই তারিখে, একই সঙ্গে একই নাটক মঞ্চস্থ করবে। এ উদ্দেশ্যে তাঁর লেখা পুন্নিমা (পরে এর নাম হয় বাসন) পান্ডুলিপি সরবরাহ করা হয়।১৭ নাসির উদ্দীন ইউসুফের পরামর্শে সেলিম আল দীন গমণ করেন পাবনা। সেখানকার পাবনা থিয়েটারের সোনাই ও সুলতান মুহম্মদ রাজ্জাকদের সাথে আলোচনাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। ঢাকা থিয়েটারের এই কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের সাথে যোগ দেয় ফেনীর সংলাপ নাট্য গোষ্ঠী ছাড়াও বগুড়া থিয়েটার, পাবনা থিয়েটার, কুষ্টিয়ার বোধন থিয়েটার, দিনাজপুরের পুনর্ভবা থিয়েটার প্রভৃতি।
এদিকে ঢাকা থিয়েটারের সহযোগিতায় ১৩৮৭ বাং, ১৯৮২ ইং তে তালুকনগরে আজহার বয়াতীর মাঘী মেলাকে একদিন থেকে তিন দিনে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রস্তুতি চলে উক্ত মেলায় ঢাকা থিয়েটারের নাটক মঞ্চায়নের। কিন্তু গ্রামের উন্মুক্ত খোলা মঞ্চে কেবলমাত্র দু’তিনটি হ্যাজাকের আলোয় কয়েক হাজার কৃষিজীবী দর্শকের সম্মুখে উপস্থাপন করার মতো কোনো পাণ্ডুলিপি কিংবা অভিজ্ঞ অভিনেতা দলে নেই। ‘মাত্র চব্বিশ কি আটাশ ঘন্টায় দোনাগাজীর সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল থেকে যাত্রার ঢঙে আধুনিক সচেতনতায় সেলিম আল দীন রচনা করে ফেলেন সয়ফুলের দইরা যাত্রা নামে নাটক তালুকনগরের মেলায় মঞ্চায়নের জন্য। লেখকের ভাষ্য হলো, ‘অতিদ্রুত লেখার ফলে রচনাটি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠল না।’ উক্ত নাটকে এক কল্পলোকের রাজকন্যার অন্বেষণ, রাজা ও রাণীর বেদনা এবং সমুদ্রাভিজানে সয়ফুলের যাত্রার কথা বলা হয়েছে। সয়ফুল গণকের নিষেধ অমান্য করে সমুদ্র যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছিল কিন্নরী জামালের জন্য। এই নাটকে দেখানো হয়েছে যে, ‘কিসমতের চেয়ে হিম্মত বড়’। ঢাকা থিয়েটারের কর্মীরাও নতুন মঞ্চ আর ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের অমৃত ভান্ডারের অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েছিল। মেলার প্রস্তুতির কাজে ঢাকা থিয়েটারের কর্মীরা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। একটি অগ্রবর্তী কর্মীদল ২/৩ দিন আগেই তালুকনগর চলে গিয়েছিল। তিনদিন ব্যাপী মেলার অনুষ্ঠানমালা (কবিগান, গাজীরগান, হাস্তরগান, আজহার বয়াতীর গান, নাটক প্রভৃতি) দিন-রাত পরিবেশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল মাটির ‘চৌকোণখোলা মঞ্চ’। অন্যান্যের সাথে রাত জেগে গোলাপ, শুভাশিষ ভৌমিক, ফারুক আহমদ, রফিক মাহমুদ প্রমুখ ঝুড়ি মাথায় নিয়ে মাটি ফেলে মঞ্চ নির্মাণ করেছিলেন সেলিম আল দীনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। ঢাকা থিয়েটার ১৫/১৬ জনের দল নিয়ে তালুকনগর গমণ করে ১৭ জানুয়ারি ১৯৮২ সালে। ‘গ্রামীণ মেলা ও নাটক প্রসঙ্গে’ শীর্ষক পুস্তিকায় ‘তালুকনগরের মাঘী মেলায় ঢাকা থিয়েটার-এর অভিজ্ঞতা অসাধারণ নৈপুণ্যে বর্ণিত আছে। মেলার দ্বিতীয় দিন (১৮ জানুয়ারি) রাত ৯ টায় মাটির খোলা মঞ্চে হ্যাজাকের আলোয় ঢাকা থিয়েটার অভিনয় করে সয়ফুলের দইরা যাত্রা। নাটকে অভিনয় করেছিলেন ঢাকা থিয়েটার কর্মী রাইসুল ইসলাম আসাদ (রাজা), শতদল বড়ূয়া বিলু (সয়ফুল), হুমায়ুন কবীর (সেনাপতি, বর্তমানে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক), শাজাহান (গণক), সরকার জাবেদ ইকবাল, রুমী, শিবলী নোমানী, কাইজার আহমদ, অনুপ প্রমুখ। নিজেদের বিপুল অসন্তুষ্টি ও অতৃপ্তি থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার গ্রামবাসীর হর্ষোৎফুল চীৎকার ও আলিঙ্গন পেয়েছেন ঢাকা থিয়েটারের অভিনেতৃবর্গ। দু’রাত প্রবল শীতে কলেজের নির্মিয়মাণ কক্ষের মাটির মেঝেতে খড়ের গাদিতে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে-বসে কাটিয়ে ভোর বেলা (১৯ জানুয়ারি) ঘোড়ার গাড়ির সহযোগিতায় ঢাকা থিয়েটার বিদায় নিয়েছে তালুকনগর থেকে। সঙ্গে করে ফিরেছে ‘এক নবতর শিল্প সৃষ্টির আকাক্সক্ষা’।

বলা হয়ে থাকে তালুকনগর মেলার অভিজ্ঞতার ফসল ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’। ঐ মেলার মাধ্যমে নৈকট্য মিলেছে কৃষিজীবী গণমানুষেরÑ অভাব যাদের নিত্য সঙ্গী; কিন্তু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তাঁরা সমৃদ্ধ। ঢাকা থিয়েটার পরের মেলায় (১৯৮৩) অংশগ্রহণ করেছিল বাসন নাটকটি নিয়ে। গ্রামীণ সংগঠনসমূহ খোলা মঞ্চে নিরাভরণভাবে স্বল্প ব্যয়ে অভিনয় উপযোগী বাসন দেশে সর্বাধিক বার মঞ্চায়িত নাটক। সেলিম আল দীন রচিত এ নাটক অভিনয় করে নিÑ এমন গ্রাম থিয়েটার সংগঠন ও নাট্যকর্মী খুঁজে পাওয়া বিরল। পর্দা টানিয়ে বিদেশের অক্ষম অনুকরণজাত মঞ্চের বদলে ঢাকা থিয়েটার প্রবর্তন করেছে চৌকোণ খোলা যাত্রা সদৃশ্য কিন্তু চারটি প্রবেশ-প্রস্থান বিশিষ্ট মাটির মঞ্চ। বাসন নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন ঐ তালুকনগর আজহার বয়াতীর মাঘী মেলায়। উক্ত নাটকে অভিনয়কারীদের মধ্যে ছিলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, কামাল বায়োজিদ, কৌশিক সাহা, বাসন্তী গোমেজ, শতদল বড়ূয়া বিলু প্রমুখ ঢাকা থিয়েটার কর্মী।
আজহার বয়াতীর মাঘী মেলায় দেখা গাজীর গানের পরিবেশনারীতি সেলিম আল দীন এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফের অভিজ্ঞতা ও ভাবনার জগৎকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে। চাপকান আর ধূতিপরা ও মখমলের টুপি পরা একজন কথক-গায়েন কয়েকজন দোহার সমেত গাজীর গানের জামাল-কামালের পালা নৃত্য-গীত ও কাব্যিক কথা মালার অপূর্ব সমন্বয়ে রাতব্যাপী পরিবেশনা দ্বারা কয়েক হাজার দর্শককে যে ভাবে বিমুগ্ধ করে রেখেছিল তা নাটক ছাড়া আর কিছু নয় এই অভূতপূর্ব উপলব্ধি একালের দুই যুগন্ধর শিল্পতাত্ত্বিককে দারুণভাবে আলোড়িত করে। প্রত্যাশা এবং নতুন পথের আলোর হাতছানি দেয় দুই বন্ধুকে। চক্ চক্ করে তাঁদের দু’জোড়া চোখ। এক গভীর উদ্যোম শীতরাত্রীর কুয়াশা ঘেরা গভীর অন্ধকারেও হাতছানি দেয় যেন আলোর ঝলকানি।
সেই কুয়াশার চাদর মোড়া শীতের রাতে হ্যাজাকের কুহকী আলোয় গাজীর গানের কথক-অভিনেতা দুই শিল্পবন্ধুর সম্মুখে উন্মোচন করে দিয়েছিল এই জনপদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের অমিত শক্তির নান্দনিক রূপ। ঔপনিবেশিক অবলেশ থেকে মুক্তির যে আলোর সন্ধানে সেলিম-ইউসুফ দীর্ঘদিন ধরে ছটপট করেছিল তাঁর সন্ধান পেযে গেলেন তাাঁরা। আবি®কৃত হলো কাব্যিক বর্ণনাত্মক রীতিতে গীতল অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে পরিবেশিতব্য রামযাত্রা, মঙ্গলনাট, মাদারপীরের গান, পালা, অষ্টক, সঙ, ঘেটু, জারি, গীতিকা, আলকাপ, গম্ভীরা, পুতুলনাচ অজস্র নাট্যআঙ্গিকে নিহিত জাতীয় নাট্যআঙ্গিকের মূল শেকড়। তালুকনগর আজহার বয়াতীর মাঘী মেলার চৌকোণ খোলা মাটির মঞ্চে তালুকনগর থিয়েটারের ছায়ায় ঢাকা থিয়েটার বাঙলা নাট্যের ঐতিহ্য, বাঙালির শিল্পদর্শন ও নন্দন ভাবনার যে সন্ধান লাভ করেছে, তারই আলোকে সৃজিত হলো তালুকনগর থিয়েটার বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সংগঠন।

৩. লক্ষ্য – উদ্দেশ্য
সূচনা থেকেই বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার একটি সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ও প্রয়োগমুখি কর্মসূচি এবং পদ্ধতিগত সাংগঠনিক কাঠামো সৃজন ও চর্চার মধ্য দিয়ে বি¯তৃতি লাভ করেছে। ১৯৮২ সালে ঢাকা থিয়েটার ‘গ্রামে চলো Ñ গ্রামে চলো’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে গ্রামীণ মেলা, নাটক, গ্রাম থিয়েটারের আদর্শ উদ্দেশ্য ও কাজ, সাংগঠনিক কাঠমো প্রভৃতি বিষয়ের নির্দেশনা সম্বলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। উক্ত পুস্তিকায় প্রকাশিত নির্দেশনার আলোকেই ধীরে ধীরে গ্রাম থিয়েটার পরিণত হয় একটি সফল ও বর্ধিষ্ণু সংগঠনে। গ্রাম থিয়েটারের প্রথম জাতীয় সম্মেলনে (৬ ও ৭ মার্চ ১৯৮৬, ঢাকা) সংগঠনের সংবিধান প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন জাতীয় সম্মেলনে কিছু কিছু সংশোধন ও সংযোজন পূর্বক যুগোপযোগী করে এই সংবিধানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বর্তমান গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রম। তবে গ্রাম থিয়েটারের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হলে প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকায় বর্র্ণিত বিভিন্ন নির্দেশাবলী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের আবশ্যক। কেননা ‘গ্রামীণ নাট্য সংগঠন’-এর কোনো প্রকার সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়নের পূর্ব পর্যন্ত ঐ পুস্তক সংবিধানের মর্যাদায় গৃহীত হয়েছিল।
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সংগঠকবৃন্দ বিশ্বাস করেন দেশকে ভালোবাসা মানে শুধুমাত্র ভৌগলিক সীমানাকে রক্ষা করা নয়, বরং তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ, সংগ্রাম, দৈনন্দিন জীবনাচারণের মধ্যদিয়ে সামাজিক মানুষ এবং জনপদের নৃতাত্ত্বিক ও প্রতœতাত্ত্বিক পরিচয়কে জানা, চর্চা করা। ভবিষ্যতের প্রতœরূপ নির্মাণে প্রয়াসী হওয়া। সংগঠনের সূচনাকালে নেতৃবর্গের অভিপ্রায় ছিল, সমাজ সংস্কৃতির বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে ও সাংগঠনিক পরিচালনায় সৃজিত হবে ঐতিহ্যবাহী, দেশজ অথচ বিশ্বমানের নূতন সংস্কৃতি; যার সাহসী কা-ারী হবে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। প্রচলিত জীর্ণ ও ঔপনিবেশিক প্রভাব দুষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চা ও দর্শনের বিরুদ্ধে প্রবল সংগ্রাম ও লড়াই করবে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। আর সেই লড়াইয়ের অন্যতম উপকরণ হবে এই জনপদের জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন এবং নন্দনতাত্ত্বিক অভিপ্রায়সমূহের অধ্যয়ন, অন্বেষণ, বিশ্লেষণ, আত্মীকরণ ও নতুনমাত্রা সৃজন।
গ্রাম থিয়েটার মনে করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চার বর্তমান ধারাটি ভ্রান্ত। এই ধারার একদিকে ক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণা, অপরদিকে লুকিয়ে আছে পুঁজিবাদের রঞ্জিত ওষ্ঠ-নখ-চুল। আধুনিকতা ও আন্তর্জাতিকতার নামে বিস্তার ঘটছে বিকৃত বাণিজ্যিক পুঁজিতান্ত্রিক উন্মূল সংস্কৃতির। মুক্তবাজার পণ্য অর্থনীতির সংস্কৃতিতে মানুষ এখন শুধুমাত্র ক্রেতা, গ্রাহকÑ পণ্য মাত্র ! এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন পুরো সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন। প্রয়োজন বিকৃতি ও ফাঙ্কিবাদের কবল থেকে সংস্কৃতিকে রক্ষা। নাটক, কবিতা, গান, সাহিত্য সবকিছু হয়ে উঠতে হবে ‘আধুনিক, গণমুখী ও প্রাণবন্ত’। আর এই সুস্থ-সাংস্কৃতিক চিরায়ত ধারাটি পুণরুদ্ধার, চর্চা, সমৃদ্ধকরণ, বেগবান ও বিকাশের কাজটি করতে বদ্ধ পরিকর গ্রাম থিয়েটার। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘সংস্কৃতির অঙ্গনে যা দেখা দিচ্ছে, প্রকাশ পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্যে যদি বিকার, নৈরাজ্য, পরসংস্কৃতির জন্য অক্ষম লোলুপতা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ না পায়, তখন নিজের অবলম্বন, নিজের খুঁটি ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য পিছনে ফেলে আসা সামগ্রীগুলোর দিকে চোখ ফেরাতেই হয়।১৮ গ্রাম থিয়েটার সেই ঐতিহ্যময় পেছনের সামগ্রীগুলোর দিকেই চোখ ফেরাতে বলছে।
সে সময় (১৯৮৩) ঢাকা থিয়েটারের পক্ষ থেকে একটি ১৬ পৃষ্ঠার নিউজপ্রিন্টের বুকলেট (পুস্তিকা) প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ক. গোড়ার কথা খ. উদ্দেশ্য গ. ঘোষণাপত্র ঘ. কিভাবে গ্রামে নাট্য সংগঠন তৈরি করতে হবে ঙ. গ্রাম সংঠনের কাজ চ. সংগঠনের কাঠামো ছ. সমস্যা জ. গ্রামীণ নাট্য সংগঠন ও মেলা পত্তনে ভ্রাতৃপ্রতিম দলগুলির ভূমিকা ঝ. তালুকনগরের মাঘী মেলায় ঢাকা থিয়েটার-এর অভিজ্ঞতা প্রভৃতি শিরোনামে দিক নিদের্শনা দেয়া হয়েছে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর। একে একটি ‘ইস্তেহার’ও বলা চলে। উক্ত পুস্তিকার আলোকে পরবর্তীকালে গ্রাম থিয়েটার গঠিত হয়। জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র বা সংবিধান প্রণীত হবার পূর্বপর্যন্ত এই পুস্তককেই মর্যাদা দেয়া হয়েছে সংগঠনের সংবিধান হিসাবে।
উক্ত পুস্তিকার ঘোষণা প্রত্রে উক্ত হয়েছে,‘পদ্মা মেঘনা তিতাস ও অশান্ত বঙ্গোপসাগরের কুলে আমাদের বাস। শতশত বছরের ইতিহাস ও ভৌগলিক পরিমন্ডলে আমরা বেড়ে উঠেছি। হাজার বছরের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি। বাংলাদেশের মঞ্চে তাই আমরা আমাদের নিজেদের জীবন, পরিম-ল ও লড়াই এর চিত্র তুলে ধরতে চাই।১৯ বর্ণিত কথন থেকে প্রতীতী হয় যে, বক্ষ্যমাণ সংগঠন বা সংগঠকবৃন্দ এই ভূখ-, জনপদ এবং জনপদের ইতিহাস- ঐতিহ্য সর্ম্পকে দারুণভাবে সচেতন। জনপদের সংগ্রামের ইতিহাস তাঁরা ধমণীতে, চেতনায় নিত্য বহন করেন। এঁদের শিল্প প্রয়াসে নিজভূমি, মানুষ এবং সমৃদ্ধ সাহসী ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছুক। তাঁদের এই অভিপ্রায়ের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল থেকেছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও মানসিকতাজাত চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শিল্পচিন্তা। ‘মের”দ-হীন আপোষকামী’ শিল্পচর্চার বিরুদ্ধে ঢাকা থিয়েটার যে প্রাণবন্ত ও প্রাণদায়ী শিল্পচর্চা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারই প্রকাশ ঘটেছে ঐ ঘোষণা পত্রে। আধুনিক নাট্যচর্চা তথা শিল্পচর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প আঙ্গিকের সমন্বয় সাধনে উক্ত সংগঠনের স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থানের পরিচয় পাওয়া যায় ঘোষণা পত্রের ঋজু শব্দমালায়। উক্ত ঘোষণাপত্রের প্রত্যয়ী উচ্চারণের শিল্পিত বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষকরি আমরা বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার এবং শিল্পতাত্ত্বিক সেলিম আল দীনের রচনা গবেষণা শিল্পদর্শন প্রভৃতি বিষয়ক ত্রিশ বছরের কর্মকা-ে।
উক্ত ঘোষণা পত্রে আরো ধৃত হয়েছে, ‘ঢাকা থিয়েটার আধুনিক নাট্য কলার সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব নাট্য আঙ্গিকের সমন্বয় সাধনে বদ্ধ পরিকর। এই জন্য আমরা চর্যাপদ থেকে পদ্মাবতী তথা বাংলাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের শিল্পকলা ও সাহিত্যরীতির যে কোন আঙ্গিকের দিকে হাত বাড়াতে প্রস্তুত।’ ঢাকা থিয়েটারের এই ঘোষণার বাস্তবরূপ তাদের পরবর্তী কার্যক্রমে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেলিম আল দীন রচিত এবং ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত বিভিন্ন প্রযোজনা এই প্রসঙ্গে র্স্মতব্য। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী বাঙলা নাট্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ‘হাস্তর’ রীতি ও আবহমান ‘পুঁিথ’র প্রেরণায় প্রণীত নতুন নাট্যআঙ্গিক ‘কথানাট্য’ সৃজন। এ নাট্যধারায় সৃজিত হয়েছে চাকা, হরগজ, যৈবতী কণ্যার মন প্রভৃতি বিশ্বমানের সাহিত্য ও নাট্য প্রয়োজনা। এ ছাড়া লোকায়ত নাট্য ধারা ‘পাঁচালি’ আঙ্গিকে সৃষ্টি হয়েছে বনপাংশুল, প্রাচ্য, ধাবমান, স্বর্ণবোয়াল, পুত্র প্রভৃতি ‘দ্বৈতাদ্বৈত’ শিল্প আঙ্গিকে প্রণীত আখ্যান বা নাট্য।
পুস্তিকায় ‘উদ্দেশ্য’ শিরোনামে বলা হয়েছে যে, ‘আমাদের সমাজে সত্যিকার অর্থে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে নাই। এ দেশের শিল্প সাহিত্য ও রাজনীতি সব সময়ই বৃহত্তর জনগণ থেকে বিছিন্ন থেকেছে। গ্রামে নাটক নিয়ে যাওয়া ও গ্রামে নাটকের দল বা সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতিকে জানা এবং বর্তমান সমাজের জীবন ধারাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা করা’। এই জনপদের আত্মার নবতর অন্বেষণ ও বৈপ্লবিক জীবনাকাক্সক্ষার মঞ্চরূপের সাধনা ও আত্মানুসন্ধানের লীলায় প্রত্যয়ী গ্রাম থিয়েটার। আর তাই ‘শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জাতীয় রীতি ও পথের অনুসন্ধানে’ তারা গ্রাম অভিমুখী।
এ প্রসঙ্গে মনে হতে পারে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভারতবর্ষে ব্যাপক আলোড়ন সৃজনকারী ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (প্রতিষ্ঠা ১ জুন ১৯৪৩ বম্বে)-এর কথা । কেননা ‘গণনাট্যের নায়ক জনগণ’ এই আদর্শবাদকে মর্মে ধারন করে ‘জনগণ কর্তৃক, জনগণ সমন্বিত, জনগণের জন্য’ এই লক্ষ্য নিয়ে গণনাট্য সংঘ গঠিত হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে ‘মার্কসীয় দর্শন বা মার্কসবাদকে উপজীব্য করে সৃজিত হয়েছিল গণনাট্য সংঘ’। তাই শুধু সংস্কৃতি বা শিল্প নয়, মানুষের বৃহত্তর রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণনাট্য সংঘের মৌল উদ্দেশ্য ছিল ফ্যসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম।২০ অর্থাৎ একটি ‘বিপ্লবী আদর্শের নির্দেশে’ জন্ম হয়েছে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের। এ ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’ মনে করে, যে কোনো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্তর্মূলে কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিশ্বাসের উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু তা কখনো প্রধান বিষয় মনে করে কোনো রাজনৈতিক দলের মেনুফেস্টোকে অনুসরণ করা ঠিক নয়। গ্রাম থিয়েটারও কিছু মূল্যবোধ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। তবে তা হবে, ‘সমগ্র জাতি যে মুক্তির পথ লক্ষ্য করে চলবে, গ্রাম থিয়েটারও থাকবে তার সাথে। সকল গণআন্দোলনে অংশ নেবে গ্রাম থিয়েটার। জাতির সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালক সকল কর্মকা-ে গ্রাম থিয়েটার থাকবে অগ্রবর্তী।’২১ এ প্রসঙ্গে সংগঠনের সভাপতির সাম্প্রতিক ঘোষণা হলো, ‘আমাদের গ্রাম থিয়েটারের প্রতিটি কর্মীর আজ এ প্রত্যয় ঘোষণা জরুরি যে নয়া সামাজ্রবাদ, ধর্মান্ধ মৌলবাদসহ সকল মানবতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আমরা লড়বো আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তির বিশ্বাসে’।২২ গ্রাম থিয়েটার বিশ্বাস করে ‘শোষিত জনগণ আমাদের নাটক, পুরো মানচিত্রটাই আমাদের মঞ্চ।২৩ অর্থাৎ গ্রাম থিয়েটার সর্বদাই বাঙলা সংস্কৃতি তথা বাঙলা নাট্যের জাতীয় আঙ্গিকের সমৃদ্ধি এবং ‘বিশ্ব শিল্পভূবনে স্ব-আসনে অভিষিক্ত করার কাজে নিয়োজিত’ থাকতে প্রত্যয়ী। গ্রাম থিয়েটার চলবে তার নিজস্ব শিল্পপথে। কর্মীদের বিশ্বাস, ‘গ্রাম থিয়েটার শিল্পীর সংগঠন, শিল্পসৃষ্টির সংগঠন’।
লক্ষণীয় যে, গণনাট্য সংঘ নাটক নিয়ে গ্রামে গিয়েছিল। সেখানে সংগীত, নৃত্য, নাটক এবং ভারতবর্ষের সকল ভাষা ও উপভাষার শক্তিশালী ঐতিহ্যময় লোকশিল্প ও লোকশিল্পীদের মাধ্যমে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যাবলী জনগণের সামনে উপস্থাপনা করে দেশবাসীর বৃটিশ বিরোধী, ফ্যসী বিরোধী মানসিকতাকে জাগরুক করে দিতে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলের পাশাপাশি সূদূর পল্লীগ্রাম এবং পাহাড়ি এলাকাতেও বি¯তৃত করতে ব্যাপৃত হয়েছিল গণনাট্য কর্মীরা। অর্থাৎ শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র এবং শহরের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা মেধাবী তাদের, জনপ্রিয় লোকশিল্পী ও জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত প্রভৃতিকে অবলম্বন করে গঠিত গণনাট্য সংঘের ‘দল’ (ঃবধস) গ্রামে গঞ্জে গিয়ে গান, নাটক ইত্যাদি পরিবেশন করে আসতো। সে ক্ষেত্রে গ্রাম থিয়েটারের ইউনিট সংগঠনে কেবল মাত্র স্থানীয় অর্থাৎ নিজ গ্রামের সদস্য দ্বারা সৃজিত অথবা নিজ এলাকায় ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পী কর্তৃক নাট্য প্রযোজনা বা লোকনাট্য, সংগীত পরিবেশিত হতে হবে। এ ছাড়া এলাকার বিলুপ্ত প্রায় ঐতিহ্যবাহী নাট্যআঙ্গিক; যেমন পুঁথি, লাঠিখেলা, গাজীরগান, হাস্তর, কিস্সা কথন ইত্যাদি সংরক্ষণ, পুনর্জাগরণ, মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে যথাসম্ভব আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক কৌশল প্রযুক্ত পূর্বক বিশ্বমানে উন্নীত করা ও গ্রাম থিয়েটারের অন্যতম মূল লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর প্রথমবর্ষে ইউরোপব্যাপী সাড়াজাগানো ইতালির র‌্যঁমা রঁলা (১৮৬৬-১৯৪৪) কর্তৃক পরিকল্পিত ‘পিপলস থিয়েটার’ এর কর্মপদ্ধতি স্মর্তব্য।
বলা হয়ে থাকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক ছিল ইউরোপের জন্য ‘এক বিস্ফোরণ সম্ভাবনার যুগ’। এই শতকের প্রথম তিন দশক অবশ্য সমগ্র বিশ্বের জন্যই ছিল সংকট, শঙ্কা, সংঘাত, অগ্রাসন আর হতাশার কাল। যেমনটা এদেশের ইতিহাসে পঞ্চাশ থেকে আশি, এই তিন দশক ছিল আন্দোলন, রাষ্ট্রবিভাজন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, সংঘাত, বিশ্বাস ভঙ্গ, অর্থনৈতিক ও জাতি ভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি, মাতৃভাষার রক্ষার সংগ্রাম, স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর হতাশা- মূল্যবোধের অবক্ষয়, মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রনা ও ক্ষোভ, স্বাধীনতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি সংস্কৃতি উৎকর্ষের সংকট ইত্যাদি দ্বারা কিষ্ট। অবশ্য ১৯১৭-এর অক্টোবর বিপ্লবের (সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা) মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বা সমাজতান্ত্রিক নন্দনতত্ত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা লাভ করেছে বিশ্ববাসী। এ সময় র্যঁমা রলাঁ সহ বেশ কিছূ রাজনৈতিক সচেতন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ চিন্তা করেছেন যে, রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জোট গড়ে তোলা প্রয়োজন যা হবে অতীত ও বর্তমানের সংযোগ রক্ষাকারী এবং আগামী দিনের দিক নির্দেশনাকারী নক্ষত্র। উপর্যুক্ত অভিপ্রায়ে একটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে রচিত হয় রঁলার ‘পিপলস থিয়েটার’ (তেরাতর দু পুপ্ল)। এর লক্ষ্য হবে দেশের রাজধানী, রাজধানী থেকে বিভিন্ন শহরে এবং শহর থেকে লক্ষ লক্ষ গ্রাম-গঞ্জে থিয়েটারকে ছড়িয়ে দেয়া। এই থিয়েটারের বিষয় হবে জনগণ, এতে অংশ গ্রহণ করবে জনগণ। অর্থাৎ জনগণের দ্বারা জনগণের জন্যই হবে ‘পিপ্লস থিয়েটার’।
গ্রাম থিয়েটারের ন্যায় ‘পিপলস থিয়েটার’ও গ্রামে গিয়ে গ্রামের মানুষ নিয়ে গড়ে তোলার কথা বলেছেন রঁলা। এছাড়া অভিনয়, নাট্য নির্মাণ, নাট্য রচনা প্রভৃতি বিষয়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে থিযেটারের কর্মীদের পারদর্শী করে তোলার কথাও বলা হয়েছে, যেমনটা গ্রাম থিয়েটারের কর্মসূচীতেও প্রত্যক্ষ করা যায়। আরও একটি বিষয় উক্ত দুই থিয়েটারের মধ্যে সামঞ্জস্য বিদ্যমান তা হলো অতীত বা ঐতিহ্য বিষয়ক সচেতনতা। উভয় থিয়েটারই মনে করে, ‘অতীত থেকে বিযুক্ত হয়ে বর্তমানের কোনো অর্থ থাকতে পারে না, ঠিক যেমনটা বর্তমান থেকে বিযুক্ত হয়ে গেলে অতীত তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। অতীত ও বর্তমান এই দুইকে মিলতেই হবে, যদি জীবনকে অর্থময় করে তুলতে হয়’।২৪ রঁলা অতীত দিনের শিল্পকে সংস্কার করার কথা বলেছেন। গ্রাম থিয়েটারও বিশ্বাস করে, ঐতিহ্য অনুবর্তী হওয়া মানে অতীতমুখী নয়, ঐতিহ্য থেকে, অতীত থেকে শিক্ষা নেয়া। তারা ‘জাতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসকে কেবলমাত্র চর্চা বা ব্যাখ্যাই নয়, তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে সচল ও উপযুক্ত করে তুলতে বদ্ধপরিকর।’
রঁলার পরিকল্পিত পিপলস থিয়েটারের সাথে গ্রাম থিয়েটারের বড় পার্থক্য বোধ হয় এখানেই যে, রঁলার থিয়েটার পরিকল্পনার মূল্য উদ্দেশ্য ‘পলিটিক্যাল স্ট্রাটেজি’; পক্ষান্তরে গ্রাম থিয়েটারের অন্বেষণ বাংলাদেশ ও বাঙলা নাট্যের নিজস্ব আঙ্গিক। অর্থাৎ একটি হলো ,রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে থিয়েটারের মাধ্যমে সে উদ্দেশ্য হাসিল করা, অপরটি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী নাট্য আঙ্গিক অন্বেষণ পূর্বক তার মধ্যে ‘নিজেদের জীবন, পরিম-ল ও লড়াই- এর চিত্র তুলে ধরে’ একটি আধুনিক অথচ ‘জাতীয় নাট্যরীতি বিনির্মাণ’।
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রথম জাতীয় সম্মেলন (৬ ও ৭ মার্চ ১৯৮৬) ৬৫টি সংগঠনের তিন শতাধিক প্রতিনিধির অংশগ্রহণে গৃহীত গঠনতন্ত্রে ব্যক্ত হয় সংগঠনের উদ্দেশ্য (ধারা : ৭) 
৭.১ শিল্পে উৎকেন্দ্রিকতাকে পরিহারপূর্বক জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের বিকাশ ঘটানো।
৭.২ প্রচলিত ও অবলুপ্ত লোক নাট্যকাঠামো ও শিল্পরীতির উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং এর চর্চা ও
পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে আধুনিক নাট্যকলার সাথে সমন্বয় সাধন।
৭.৩ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার সৃষ্টিশীল বিকাশকে ত্বরান্বিত করা।
৭.৪ মেলা পত্তন ও মেলা সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটানো।
৭.৫ ঐতিহ্যবাহী অভিনয়রীতির উৎকর্ষ সাধন ও অভিনয়ের আধুনিকায়ন।
৭.৬ বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী খোলা মঞ্চের ব্যাপক প্রসার ঘটানো।
৭.৭ জনগণের সংস্কৃতিকে সমগ্র জাতির প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা।
৭.৮ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাট্যমঞ্চে জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের পরিচিতি তুলে ধরা।
৭.৯ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম গ্রহণ।

৪. কার্যক্রম
উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার বিগত তিন দশকে সংগঠিত করেছে বিপুল সংখ্যক নানা পেশা ও ধর্ম-বর্ণের নাট্যকর্মীকে। একাধিক জাতীয় সম্মেলনে উচ্চারণ করেছে ‘জনবিচ্ছিন্ন মধ্যবিত্ত শিল্প সাধনার বিরুদ্ধে মিলিত প্রতিবাদ’। এছাড়া প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে ‘আমাদের সাংস্কৃতিক বিবেককে জাগ্রত’ করার নিমিত্তে। বিশ্বনাট্য মঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক ও নিজস্ব অভিনয়রীতি প্রতিষ্ঠা এবং বাঙলা নাটকে বর্ণনাধর্মী রীতির পুনরুজ্জীবনে বিশ্ব মঞ্চে নতুন প্রাণ সৃষ্টির অভিপ্রায়ও ব্যক্ত হয়েছে বারবার। বিগত তিরিশ বছর বাংলাদেশ গ্রামথিয়েটার অতিক্রম করেছে নানান চড়াই উৎরাই, নানান বাঁক। এই সময়কালে উল্লিখিত ঘোষণা, উচ্চারণ, লক্ষ্য, ইচ্ছা, অভিপ্রায়, আকাক্সক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে অর্জন এবং ব্যর্থতার হিসাবের খেরোখাতার দৈর্ঘ্যও কম নয়। গ্রাম থিয়েটার কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি, সংগঠনিক কাঠামো-কর্মতৎপরতা, সংগঠন সৃজন ও কর্মকা- পরিচালনা, মেলা ও উৎসব আয়োজন বা পত্তন এবং এর ধারাবাহিকতা, নাটক রচনা-অভিনয়-নির্দেশনা-পরিকল্পনা বিষয়ে নাট্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পাঠ ও পাঠাগার সৃজন কর্মসূচি, ঐতিহ্যবাহী নাট্যনমুনা সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধির কার্যক্রম, লোকসংস্কৃতি গবেষণা স্কুল কার্যক্রম, প্রকাশনা, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রাম থিয়েটার কর্মীদের সম্পৃক্তি ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে বিভিন্নজন বিভিন্ন সময়ে বেশকিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেছেন। ব্যক্ত করেছেন তাঁদের মূল্যবান মন্তব্য-অভিমত। আশার কথা এই যে, সংগঠনের অভ্যন্তরেও চর্চা আছে আলোচনা সমালোচনার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্রাম থিয়েটারের নির্বাহী পর্ষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যিনি একাধারে একজন প্রতিষ্ঠিত নন্দনতত্ত্বের গবেষক, লেখক ও নাট্যতত্ত্বের শিক্ষক- তিনি গভীর দায়িত্ববোধের তাগিদ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন গ্রাম থিয়েটারের বিগত তিরিশ বছরের কার্যক্রম। বিশেষ করে সংগঠনের ব্যর্থতার প্রসঙ্গগুলিকে তিনি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশ করেছেন। তাঁর মূল্যায়ণ ও অভিমতসমূহ অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়। নানাজনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণাধি বিবেচনায় রেখে আমরা নিম্নে তুলে ধরছি গ্রাম থিয়েটারের অর্জন, সমস্যা সংকট, সম্ভাবনার নানা দিক।

নিম্নে উল্লেখ করা হলো বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অর্জনসমূহের সংক্ষিপ্ত চিত্র :
* বাঙলা নাট্যের হাজার বছরের উজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নমুনা এবং তত্ত্বগত ভিত্তি আবিষ্কার।
* জাতীয় নাট্যআঙ্গিকের তত্ত্ব প্রদান।
* গ্রাম থিয়েটার কর্তৃক মেলা পত্তনের মধ্য দিয়ে এদেশে সূচিত হয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নব জাগরণ।
* এদেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছে নাটককে ব্যাপকভাবে বিনোদন এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা মাধ্যমরূপে পরিচিত এবং জনপ্রিয় করে তোলা।
* বাংলাদেশের নাটকে মানুষ, জীবন, জীবন সংগ্রামের কথা, লোকায়ত শিল্পরীতির ব্যবহার প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে নতুন বেগ সঞ্চায়িত হয়েছে তার পেছনে কাজ করেছে গ্রাম থিয়েটারের তত্ত্ব ও অভিজ্ঞতা।
ক্স এ জনপদে শিল্পরীতি ও জীবন সংগ্রাম অন্বিষ্ট নাটক রচনার উৎস-প্রেরণা হিসেবে ক্রিয়াশীল গ্রাম থিয়েটারের শিল্পতত্ত্ব।
* কৃত্রিম বিরক্তিকর সাহেবী ভাষার বদলে গ্রাম থিয়েটার মঞ্চে তুলে এনেছে এদেশের পলি-মাটি ও অজস্র প্রজাতির ধানফুলের গন্ধমাখা নানান জেলার নানান ভাষা রীতি।
* দেশীয় শিল্পরীতির নাট্যাঙ্গিক তথা লোকজ নাটক ও নাট্যরীতিকে সুসংগঠিত করে এর চর্চাকে উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব পালন করেছে গ্রাম থিয়েটার। যেমন- গাজীরগান, হাস্তর, কিস্সা, লাঠিখেলা, জারি, সঙযাত্রা, পুতুলনাচ ইত্যাদি নানান লোকজ শিল্পমাধ্যম গ্রাম বাংলায় এখন পূর্বের চেয়ে অনেক সজীব ও সচল।
* ইউরোপীয় মঞ্চ ও নাট্যরীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যআঙ্গিকের পরিচয় বহনকারী ঐতিহ্যবাহী চৌকোণ খোলা মঞ্চের প্রবর্তন।
* বাঙলা লোকনাট্য উৎসব চালু করণের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য গম্ভীরা, কিস্সা কাহিনী, বাউলগান, মাদারগান, কুশানগান, আলকাপ, ভাসানযাত্রা প্রভৃতির সাথে নতুন প্রজন্মের দর্শকের যোগসূত্র স্থাপন।
* পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নাটক রচনা, অভিনয়, নাট্য প্রযোজনা, সাংস্কৃতিক সংবাদ পরিবেশনা ইত্যাদি বিষয়ে গ্রামীণ নাট্য কর্মীদের দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
* ঐতিহ্যবাহী বাঙলানাট্যের অভিনয় ও পরিবেশনা কৌশল নিয়ে নিরীক্ষা, পরীক্ষা ও গবেষণাপূর্বক কাল-উপযোগী প্রযোজনা প্রস্তুত করণের প্রশিণের ব্যবস্থা করেছে। যেমন- মহুয়া, দেওয়ানা মদিনা, গাজীরগান প্রভৃতির নবায়নকৃত মঞ্চায়ন।
* দক্ষ নারী নাট্যকর্মী সৃজনের লক্ষ্যে আয়োজন করেছে একাধিক কর্মশালার।

৫. সংকট/সমস্যা
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের ইতিহাস, তত্ত্ব, কার্যক্রম, সাংগঠনিক বিকাশ ও মাঠপর্যায়ের জরিপের আলোকে যে সকল সংকট বা সমস্যা দৃষ্ট হয়েছে সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ-
* শিল্প চেতনা সমৃদ্ধ নাটকের ঘাটতি;
* সাংগঠনিক কর্মীদের পারস্পরিক কোন্দল, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, জীবিকার অনিবার্য তাগিদে দেশত্যাগ, অঞ্চল ত্যাগ কিংবা দলের কার্যক্রম থেকে দূরে সরে গেছেন;
* আজও গ্রাম থিয়েটারের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক উৎস নেই। অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে দীর্ঘ দিনেওদাঁড়ায় নি কোনো স্থায়ী কাঠামো;
* ১৯৯০-৯৪ পর্যন্ত জাতিসংঘ ও অন্য দু’একটি দেশের জন কল্যাণমূলক কার্যক্রমে (পারিবারিক সমস্যা, সেনিটেশন, সেলাইন) অংশগ্রহণ, কিন্তু এতে কেন্দ্রের সাথে মাঠ পর্যায়ের সংগঠনের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসে। অনেক কর্মীর সাথে আদর্শগত সংকট তৈরি হয়। বেশ কিছু সক্রিয় কর্মী ঘএঙ-তে চলে যায়। গ্রাম থিয়েটার ঐ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়;
ক্স নব্বই-একানব্বইতে কোনো কোনো বিশ্বাসভাজন কর্মীর ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের ফলে সংগঠনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়;
* ঘএঙ সম্পর্কে গ্রাম থিয়েটারের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা। ঘএঙ-র হাতছানি থেকে সংগঠক-কর্মীদের বিযুক্ত রাখা যায় নি; অথবা ঘএঙ সম্পর্কে কোনো সঠিক দিক নির্দেশনা তৈরি হয় নি;
* একদা অত্যন্ত গতিশীল অনেক সংগঠন ও নাট্যকর্মীর (যেমন কিশোরগঞ্জ নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলের সংগঠনসমূহ) নিষ্ক্রীয়তা অত্যন্ত দুঃখজনক;
* লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে কর্মী সংগঠকবৃন্দ স্পষ্ট নন;
* প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি কর্মীবৃন্দ;
* কেন্দ্র বা নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা তৈরি হয় নি;
* গ্রাম থিয়েটারের তত্ত্ব ও আদর্শকে লালন করে মূল সংগঠন ঢাকা থিয়েটার সমানভাবে বেড়ে ওঠে নি;
* পাঠ প্রবণতা কোনো পর্যায়ে গড়ে তোলা সম্ভব হয় নি;
* রাজনৈতিক বলয় থেকে মুক্ত থাকতে পারে নি কর্মীবৃন্দ;
* গ্রাম থিয়েটারের আদর্শ-উদ্দেশ্য এবং জাতীয় নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণে সেলিম আল দীন ছাড়া আর কোনো বলিষ্ঠ নাট্যকার তৈরি হয় নি;
* সেলিম আল দীন-এর নাটক দু’একটি ছাড়া, বিশেষ করে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণের লক্ষ্যে রচিত পাঁচালি আঙ্গিকের নাটক মঞ্চস্থ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে নি কোনো সংগঠন;
* সাংগঠনিক মনিটরিং-এ তৈরি হয় নি ধারাবাহিকতা;
* কর্মীদের নিয়মিত বসা বা চর্চা করার মত কোনো কার্যকর কর্মসূচী প্রবর্তন করা সম্ভব হয় নি;
* সংগঠনের নেই কোন সুনির্দিষ্ট দপ্তর;

৬. সম্ভাবনা/প্রস্তাবনা
বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার তাদের প্রতিশ্রুত কার্যক্রমের মাধ্যমে শিল্পমনস্ক ও ঐতিহ্যপ্রিয় দেশপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ে স্বপ্ন জাগিয়েছে, উপনিবেশিক কিষ্ট মানসিকতার ঝুল সরিয়ে অতীত ঐতিহ্যের সত্য জ্যোতি সৃজন করেছে। গ্রাম থিয়েটারের স্বপ্নদ্রষ্টার দৈহিক প্রয়ান ঘটেছে। কিন্তু তাঁর শিল্পতত্ত্ব, দর্শন, প্রদর্শিত পথের ঠিকানা অজস্রভাবে বি¯তৃত। তাঁর শিল্পতত্ত্বের ভিতর দিয়ে তিনি সর্বদাই বিদ্যমান। গ্রাম থিয়েটারকে থামতে দেয়া যাবে না, তাঁর প্রদর্শিত পথকে সৃষ্টি ও কর্মের আলোকমালায় উদ্ভাসিত করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে সামনে। আর সে জন্য প্রয়োজন সয়োপযোগী কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বিবিধ বিষয় পর্যবেক্ষণ পূর্বক কতিপয় প্রস্তাবনা মনে এসেছে। সে গুলি হলো-
* গ্রাম থিয়েটারের সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মকৌশল যুগের উপযোগি করে পুনর্গঠন করা;
* গ্রাম থিয়েটারের স্থায়ী আয়ের উৎস সৃজন;
* যোগাযোগ, সংরক্ষণ ও মনিটরিং সেল গঠন;
* পাঠক্রম চালুকরণ এবং অব্যাহত রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ;
* কেন্দ্র থেকে বা কেন্দ্রের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ সংগঠনসমূহকে প্রদানের ব্যবস্থা করা (এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা/সংগঠনের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে);
* সেলিম আল দীনের রচনাসহ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, হাসান আজিজুল হক, জীবনানন্দ দাশ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখের রচনাসহ নির্বাচিত লেখকদের লেখা সংগঠনের পাঠাগারে রাখা এবং পাঠ বাধ্যতামূলক করা এবং মনিটরিং-এর ব্যবস্থা;
* ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, রাষ্ট্র ও সমাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, নন্দনতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে উৎস ব্যক্তিদের দিয়ে বক্তৃতা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করা;
* গ্রাম থিয়েটারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শন, তত্ত্ব, তথ্য ইত্যাদি সহ গ্রন্থ প্রকাশ;
* সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ (গ্রাম থিয়েটারের দর্শনজাত) সৃষ্টিসমূহ প্রযোজনার জন্য পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ;
* বাঙলা ভাষার বিখ্যাত নাটক, গল্প, কবিতা/কাব্য, উপন্যাস ইত্যাদি মঞ্চায়নে সংগঠনসমূহকে তালিকা প্রদান/বাধ্যবাদক করে দেয়া। স্বল্প পরিসরে ভিন্ন ভাষার ধ্রুপদী নাটকের দেশীয় পটভূমিতে রূপান্তরকৃত পাণ্ডুলিপি অভিনয়ের অনুমতিও দেয়া যায়।
* ১৯৮৮ সালের ন্যায় অন্ততপক্ষে দু’বছর অন্তর ঢাকায় গ্রাম থিয়েটার নাট্যমেলার আয়োজন করা;
* ভিডিও সিডি সরবরাহ দ্বারা ঢাকা থিয়েটারসহ বিভিন্ন নাট্যদলের এবং সম্ভব হলে দেশের বাইরের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা গ্রাম থিয়েটারের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের দেখানোর উদ্যোগ;
* আদর্শ ও উদ্দেশ্যের অভিন্নতা হেতু গ্রাম থিয়েটার এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ বলা যায় একই সূত্রে গাঁথা। সুতরাং দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বিনিময় মূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন, নাট্যতত্ত্ব বিভাগের গবেষণামূলক প্রযোজনাসমূহের প্রদর্শনী গ্রাম থিয়েটারের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, পক্ষান্তরে গ্রাম থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য মানসম্পন্ন প্রযোজনার প্রদর্শনী জাবি (মুক্তমঞ্চ বা খোলামঞ্চ) তে করার ব্যবস্থা। নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের নিমিত্তে বিভিন্ন গ্রাম থিয়েটারে প্রেরণ এবং নাট্যতত্ত্ব বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে গ্রাম থিয়েটারের কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা, বিভাগ থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাশকৃত কৃতি শিক্ষার্থীদের দ্বারা গ্রাম থিয়েটারের নাট্য নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদি;
* ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনাগুলো গ্রাম থিয়েটার কর্মীদের দেখানোর বিশেষ কর্মসূচী;

উপসংহার
বাঙলা ও বাঙালি সংস্কৃতির উৎস সন্ধানে পথ যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। সে সময়টা ছিল স্বৈরাচারের উত্থান; সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পদচারণায় বিপর্যস্ত দেশ। রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলি বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী কতিপয় বীর ঐ ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেও মঞ্চের পাশাপাশি গ্রামের পথ, মাঠ আর মাটির মঞ্চকে বেছে নিয়েছিল স্বপ্নপূরণের পান্থশালা হিসাবে। ঐতিহ্যবাহী মেলা পত্তন, লোকায়ত ধারার সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের পুনরুজ্জীবন এবং বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণের ব্রত নিয়ে ডানা মেলেছিল গ্রাম থিয়েটার নাম শিল্প পাখিটি। গ্রামীণ মেলা পত্তন, দেশীয় নাটক রচনা, বাঙলা নাটকের ভাষা নির্মাণ, বাঙলা নাটকের আঙ্গিক স্বরূপ সন্ধান, ঐতিহ্যের পুনঃসৃজন, জাতীয় মঞ্চ-আঙ্গিক আবিষ্কার নাট্যমেলা-নাট্যোৎসব, কর্মশালা, পাঠচক্র সৃজন, বাঙলা নাট্যের প্রকৃত ইতিহাস উন্মোচন ইত্যাদির আলোকে গ্রাম থিয়েটার তাদের তাত্ত্বিক অগ্রগতি অনেকটাই করতে পেরেছে।
জাতীয় নাট্যআঙ্গিকের প্রামাণ্য সংগ্রহ ও ঐ রীতির আংশিক প্রতিষ্ঠা লাভে সক্ষম হয়েছে। এদেশের গ্রামে বসবাসকারী শ্রমজীবী মানুষের নিকট নাটককে বিনোদন এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমরূপে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছে গ্রাম থিয়েটার। জাতীয় নাট্য আঙ্গিক অন্বেষণে ঐতিহ্যবাহী নাট্যআঙ্গিক আধুনিক বিজ্ঞান মনষ্ক প্রয়োগকৌশলের সমন্বয়ে মঞ্চে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে তারা। এই জনপদে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাদের জীবন ও সংস্কৃতি ইত্যাদিও স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের নন্দনভাবনায়। গ্রাম থিয়েটার জীবনের ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমির সঙ্গে ভাষার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে গ্রাম থিয়েটার মঞ্চে তুলে এনেছে অঞ্চলের মানুষের ভাষা।
দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন বা পরিস্থিতির কারণে গ্রাম থিয়েটারের কার্যক্রম একই গতিতে চলে নি। অনুষ্ঠিত হয় নি জাতীয় সম্মেলনসমূহ। প্রতি দু’বছর অন্তর জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের গঠনতান্ত্রিক বাধ্যকতা থাকলেও অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ছয়টি। গ্রাম থিয়েটারের সাংগঠনিক কার্যক্রম, নাটক মঞ্চায়ন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার ব্যায় ইত্যাদি নির্বাহের জন্য অর্থনৈতিক কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় সংগঠনের কর্মকা- ব্যহত হয়। অর্থ আয়ের কোনো স্থায়ী পন্থা সৃষ্টি না করতে পারা দলটির একটি বড় দূর্বলতা।
বলা হয়েছে ‘গ্রাম থিয়েটার শিল্পীর সংগঠন, শিল্প সৃষ্টির সংগঠন’। তথাপি একথা মানতেই হয় একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্তরে কিছু রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকে। গ্রাম থিয়েটার স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্য, জাতীয় আঙ্গিক প্রভৃতি সম্পর্কে সোচ্চার। দেশের গণআন্দোলন কিংবা জাতীয় গণমুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকা-ে গ্রাম থিয়েটারের সদস্যদের অংশ নিতে উদ্ভূদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে বিভিন্ন সময় নানা সংকটের সম্মুখীন হতে হয় সংগঠনটিকে।
গ্রাম থিয়েটারের কর্মপন্থার অনুসারী হয়ে দেশে বেশ কয়টি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে আর্থিক লাভালাভের বিবেচনায় অনেক গুণি সদস্যকে হারাতে হয়েছে সংগঠটিকে। এ বিষয়ে সতর্ক ও সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক।
নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে গ্রাম থিয়েটারের ইউনিট সংগঠনগুলি খুব বেশি এগোতে পারে নি। গ্রাম থিয়েটারের নির্ধারিত স্বল্প সংখ্যক পাণ্ডুলিপি এবং প্রচলিত ধারার নাটক মঞ্চায়নের উদাহরণই অধিক। সেলিম আল দীন-এর মুখ্য শিল্পতত্ত্বে সৃজিত নাট্যসমূহ গ্রাম থিয়েটারের মঞ্চায়ন তালিকায় মেলে নি। এতে করে গ্রাম থিয়েটারের প্রকৃত শিল্পতত্ত্ব, বিশেষ করে বর্ণনাত্মক বাঙলা অভিনয়রীতির প্রয়োগ ও অনুশীলন খোদ গ্রাম থিয়েটারের কর্মীদের নিকটই অপরিজ্ঞাত থেকে গেছে। এ বিষয়ে জরুরি ভাবনা-চিন্তা ও কর্মপন্থা উদ্ভাবন আবশ্যক।
সকল সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের গতিপথে সৃজিত হয় নানা বাঁক, নানা প্রতিবন্ধকতা। কখনো সরল, কখনো বন্ধুর অমসৃন চলার পথ পাড়ি দিতে হয়। গ্রাম থিয়েটার তার ব্যতিক্রম নয়। তার পরও এই সংগঠনের প্রাপ্তির হার তুলনামূলকভাবে কম নয়। আশা করা যায় গ্রাম থিয়েটার তার হাতের মুঠোয় হাজার বছর নিয়ে চলবে সামনে। চলো গ্রাম থিয়েটার চলো।

টীকা
১. সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলানাট্য, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৬; পৃষ্ঠা- ৩।
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২।
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩।
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২।
৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪।
৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৬।
৭. কাজী দীন মুহম্মদ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (৪র্থ খ-), স্টুডেন্ট ওয়েজ, বাংলাবাজার, ঢাকা, আগস্ট ১৯৬৯; পৃষ্ঠা- ১।
৮. শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাঙলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খ-), পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, এ. মুখার্জী অ্যান্ড কোং প্রা. লি. ১৯৬৮; পৃষ্ঠা-৯৭।
৯. ক. ড. প্রদ্যোত সেনগুপ্ত; বাঙলা নাটক, নাট্যতত্ত্ব ও রঙ্গমঞ্চ প্রসঙ্গ (১ম খ-) প্রকাশক; শ্রী কান্তি রঞ্জন ঘোষ, বর্ণালী ৭৩, মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা, নভেম্বর, ১৯৮২; পৃষ্ঠা- ৩৫০।
খ. কাজী দীন মুহম্মদ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (৪র্থ খ-), স্টুডেন্ট ওয়েজ, বাংলাবাজার, ঢাকা, আগস্ট ১৯৬৯, পৃষ্ঠা- ২।
১০. হায়াৎ মাহমুদ, গেরাসিম স্তেপানভিচ লিয়েবেদেফ, বাংলা একাডেমী ১৯৮৫; পৃষ্ঠা ………।
১১. জসিম উদ্দীন, আমাদের লোকনাট্য (প্রবন্ধ), কবি জসিম উদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ (প্রথম খ-), ঢাকা ১৯৯০; পৃষ্ঠা- ২৯।
১২. বিশ্বজিৎ ঘোষ, বাংলাদেশের নাটক (প্রবন্ধ), সম্পাদনা-মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ‘সুন্দরম’, ঢাকা, শরৎ ১৪০৩; পৃষ্ঠা- ১২।
১৩. অসীম সাহা, বাংলাদেশের নাটক : অন্তর্গত উপলব্ধি (প্রবন্ধ), সম্পাদনা রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা, মুক্তধারা, ১৯৮৬; পৃষ্ঠা-১৬৪।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১৬৪।
১৫. মামুনুর রশীদ, ঢাকা থিয়েটারের নাট্যচর্চা (প্রচ্ছদ প্রতিবেদন), সচিত্র সন্ধানী, সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ, ৫ম বর্ষ ৪৯ সংখ্যা, ১০ এপ্রিল ১৯৮৩; পৃষ্ঠা- ১২।
১৬. মোঃ আমিনুর রহমান মানিক, সেলিম আল দীন ও গ্রাম থিয়েটার (প্রবন্ধ), গ্রাম থিয়েটার, সম্পাদক-ইউসুফ খসরু, সেলিম আল দীন জন্ম জয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা, ১৮ আগস্ট ২০০৮; পৃষ্ঠা- ৫৪।
১৭. নারায়ণ নাগ, নাটক নিয়ে গ্রামে চল চট্টগ্রাম বিভাগে গ্রাম থিয়েটারের অগ্রযাত্রা, গ্রাম থিয়েটার, সম্পাদক-আমিরুল ইসলাম টিপু, ৭ম বর্ষ, ১০ম সংখ্যা, মাঘ-চৈত্র ১৩৯৫; পৃষ্ঠা- ১৬।
১৮. হাসান আজিজুল হক, বাঙালি সংস্কৃতির জীবন-মরণ (নিবন্ধ) গ্রাম থিয়েটার বুলেটিন, সম্পাদক-মোসাদ্দেক মিল্লাত, ষোড়শ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, জুলাই ১৯৯৮; পৃষ্ঠা- ৭।
১৯. গ্রামীণ মেলা ও নাটক প্রসঙ্গে, পুস্তিকার ঘোষণাপত্র, পৃষ্ঠা -৩।
২০. তাপস বসু, ভাঙনের থিয়েটার, বঙ্গবাসী লি: (প্রেস), কলকাতা, অক্টোবর ১৯৮৩; পৃষ্ঠা- ৪০।
২১. সেলিম আল দীন, সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন স্মরণিকা, কুষ্টিয়া ৩১ মার্চ-১ এপ্রিল ১৯৮৯।
২২. নাসির উদ্দীন ইউসুফ, সভাপতির অভিভাষণ, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, ৬ষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন ২০০৮ স্মরণিকা, ঢাকা ১৪ নভেম্বর ২০০৮।
২৩. সেলিম আল দীন, সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন স্মরণিকা, কুষ্টিয়া, ৩১ মার্চ-১ এপ্রিল ১৯৮৯।
২৪. গ্রামীণ মেলা ও নাটক প্রসঙ্গে, পুস্তিকার ঘোষণাপত্র, পৃষ্ঠা- ২।